বানরও জ্যামিতি বোঝে

বানরও জ্যামিতি বোঝে

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ জুলাই, ২০২৬

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল জ্যামিতিক আকারের সমতা, সমান্তরাল রেখা বা সমকোণ সহজে চিনতে পারার ক্ষমতা বোধহয় মানুষেরই একান্ত বৈশিষ্ট্য। হয়তো মানুষের মস্তিষ্কে আকার ও জ্যামিতি বোঝার জন্য বিশেষ ধরনের মানসিক নিয়ম বা প্রতীকভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা অন্য প্রাণীদের নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা সেই চিরাচরিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে । গবেষণায় দেখা গেছে, বানরও মানুষের মতো জ্যামিতিক সম্পর্ক বুঝতে পারে এবং তাদের চিন্তাভাবনার ধরনের সঙ্গে মানুষের আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন বোধবুদ্ধি স্নায়ুবিজ্ঞানী জেসিকা ক্যান্টলন। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা একটি বিশেষ টাচস্ক্রিন-ভিত্তিক খেলা তৈরি করেন। এতে প্রথমে একটি জ্যামিতিক আকৃতি দেখানো হয়, তারপর দুটি ছোট আকৃতির মধ্যে সঠিক মিলটি বেছে নিতে হতো। আকৃতিগুলোর রং, আকার ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রাখা হয়, যাতে অংশগ্রহণকারীরা শুধু জ্যামিতিক সম্পর্ক বুঝে উত্তর দিতে বাধ্য হয়। গবেষকদের মতে, কাজটি দেখতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি বেশ কঠিন।

এই পরীক্ষায় অংশ নেয় নিউইয়র্কের সেনেকা পার্ক চিড়িয়াখানার অলিভ বাবুন, রিসাস ম্যাকাক, ৩ থেকে ৬ বছর বয়সী ৫৮ জন শিশু, বলিভিয়ার তসিমানে জনগোষ্ঠীর ৭৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২১ জন প্রাপ্তবয়স্ক। ফলে গবেষকেরা একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতি, বয়স ও সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষের কাজকর্ম তুলনা করতে সক্ষম হন।

ফলাফলে দেখা যায়, শুধু মানুষ নয়, বানরও জ্যামিতিক আকার বুঝতে উচ্চস্তরের মানসিক কৌশল ব্যবহার করে। বিশেষ করে আকৃতিগুলো ঘুরিয়ে দেখানো হলে বানরেরা বুঝতে পারে যে ঘুরে গেলেও সেটি একই আকৃতি। এই ধরনের বিমূর্ত চিন্তাশক্তি এতদিন কেবল মানুষের বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হতো। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বানরের এই ক্ষমতা মানুষের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হলেও তা বাস্তব। ছোট শিশুদের দক্ষতার সঙ্গে তার অনেকটাই মিল রয়েছে।

গবেষকেরা আরও লক্ষ্য করেন, প্রাক-প্রাথমিক বয়সের শিশুদের চিন্তার ধরনে বানরের সঙ্গে বেশ মিল থাকলেও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতীকভিত্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা আরও উন্নত। এ থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে মানুষের জ্যামিতিক দক্ষতার একটি অংশ জন্মগত হলেও শিক্ষা ও জীবন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তা আরও পরিণত হয়। বলিভিয়ার তসিমানে জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও এই বিষয়টি বোঝাতে সাহায্য করেছে, কারণ তাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এতে গবেষকেরা শিক্ষা ও বয়সের প্রভাব আলাদা করে বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন।

গবেষকদের মতে, মানুষের জ্যামিতিক চিন্তার শিকড় সম্ভবত প্রাইমেটদের সাধারণ বিবর্তনীয় ইতিহাসে নিহিত। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ পাথর বা হাতির দাঁতে জ্যামিতিক নকশা খোদাই করলেও সেই চিন্তার মৌলিক ভিত্তি হয়তো আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই এসেছে। এই আবিষ্কার শিশুদের জ্যামিতি শেখানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে, শিশুদের জ্যামিতি শেখানোর সময় ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তারা একেবারেই শূন্য থেকে শুরু করছে। বরং তাদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা প্রাকৃতিক জ্যামিতিক ধারণা ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষা আরও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

সূত্র: Proceedings of the National Academy of Sciences,21st July 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × two =