বার্ধক্যর লিঙ্গভেদ ও সার্টুইন প্রোটিন 

বার্ধক্যর লিঙ্গভেদ ও সার্টুইন প্রোটিন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ জুন, ২০২৬

বার্ধক্য প্রতিটি মানুষের জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সমান তালে কাজ করে না। পরিসংখ্যান বলছে, নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘায়ু হন। তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁরা অধিক শারীরিক দুর্বলতা এবং নানা বয়সজনিত সমস্যার মুখোমুখি হন। দীর্ঘসময় ধরে বিজ্ঞানীরা লিঙ্গভেদে এই বৈপরীত্যের জৈবিক কারণ অনুসন্ধান করে আসছেন। সম্প্রতি নেচার পত্রিকাতে প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই রহস্যের খানিকটা কাছাকাছি গেছে এবং একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্রের হদিশও মিলেছে। গবেষকদের ইঙ্গিত এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রাচীন সার্টুইন গ্রুপের প্রোটিন।

সার্টুইন প্রোটিন জীববিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর উত্তরাধিকার। ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত, ধরতে গেলে প্রায় সব জীবের মধ্যেই এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কোটি কোটি বছরের বিবর্তন সত্ত্বেও এদের গঠন ও কার্যকারিতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে, যা এদের অপরিসীম গুরুত্বের প্রমাণ। এই প্রোটিনগুলোর মৌলিক কাজ হল- ডিএনএকে সুশৃঙ্খল রাখা, জিনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জিনগত উপাদান মেরামত করা।

বিজ্ঞানীরা এটা আগেই জানতেন যে, সার্টুইন নামক প্রোটিন পরিবারের কিছু জিনের অভাব অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁরা কোনো একটা পরীক্ষায় দেখেছিলেন, বিশেষ করে SIRT7 নামের একটি জিন অনুপস্থিত থাকলে ইঁদুরের শরীরে দ্রুত বার্ধক্যের প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু এই প্রভাব নারী ও পুরুষের মধ্যে কেন ভিন্ন হয়, সেটা নিয়ে তাঁদের ধারণা এতদিন খুব স্পষ্ট ছিল না।

এবার এই রহস্যের কিনারা করতে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল SIRT7-বিহীন ইঁদুর নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা চালায়। তাতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ফল পাওয়া গেছে। দেখা যায়, SIRT7-এর অভাবে স্ত্রী ইঁদুরের শরীরে পুরুষ ইঁদুরের তুলনায় ডিএনএ-র ক্ষতিঅনেক বেশি হয়। শুধু তাই নয়, তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি দ্রুত ঘটে এবং জীবনকালও কমে যায়।

গবেষকরা এরপর কোষের গভীরে প্রবেশ করে এই বৈষম্যের আণবিক ভিত্তি অনুসন্ধান করেন। সেখানেই উঠে আসে X ক্রোমোজোমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টা। স্ত্রী প্রাণীর দুটি X ক্রোমোজোম (44A+XX) থাকে, যেখানে পুরুষের (44A+XY) থাকে মাত্র একটি। এই অতিরিক্ত জিনগত কার্যকলাপের ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্ত্রী প্রাণীর কোষে সাধারণত একটি X ক্রোমোজোম নিষ্ক্রিয় বা বলা যায় একপ্রকার নীরবই থাকে।

এই গবেষণায় দেখা গেছে, এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে SIRT7 একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু SIRT7 অনুপস্থিত থাকলে সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। নিষ্ক্রিয় X ক্রোমোজোম আরও বেশি নীরব হয়ে যায়, আর সক্রিয় X ক্রোমোজোম অস্বাভাবিকভাবে অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে জিন নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং জিনোমের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ডিএনএ-র ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করে এবং হরেকরকম রোগের পথ প্রশস্ত করে।

এই আবিষ্কার শুধু বার্ধক্য নিয়ে গবেষণার জন্যই নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায় কেন অনেক বয়সজনিত রোগ নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্ন হারে বা ভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়—যেমন স্নায়বিক অবক্ষয়, হৃদ্‌রোগ বা কিছু জিনগত ব্যাধি। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে লিঙ্গভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা উন্নয়নের নতুন পথের দিশাও দিতে পারে।

সুস্থ বার্ধক্যের চাবিকাঠি শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, বরং জীবনের প্রতিটি স্তরে জৈবিক ভারসাম্য রক্ষা। আর সেই ভারসাম্যের অদৃশ্য প্রহরী হিসেবে SIRT7-এর মতো ক্ষুদ্র প্রোটিন যে কত বড় ভূমিকা পালন করে, এই গবেষণা তারই জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।

সূত্র: Nautilus magazine, 18th June 2026, published in Nature journal.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × one =