বাস্তবতা কি চেতনারই প্রক্ষেপ?

বাস্তবতা কি চেতনারই প্রক্ষেপ?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ মার্চ, ২০২৬

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এক সাহসী প্রশ্ন তুলেছেন মারিয়া স্ট্রোম। উপ্সালা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে (প্রকাশিত AIP Advances–এ) এমন এক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, যা বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর দাবি—চেতনা মস্তিষ্কের ফল নয়; বরং চেতনাই মহাবিশ্বের প্রাথমিক ভিত্তি। স্থান, কাল এবং পদার্থ—সবই সেই চেতনা থেকে উদ্ভূত।

ন্যানোপ্রযুক্তি ও উপাদানবিজ্ঞানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্ট্রোম এবার দৃষ্টি ঘুরিয়েছেন সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নের দিকে: বাস্তবতার প্রকৃতি কী? তাঁর প্রস্তাবিত তাত্ত্বিক কাঠামোতে চেতনাকে একটি মৌলিক ক্ষেত্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা সবকিছুর পিছনে কাজ করছে। ব্যক্তিমানস, আমাদের অভিজ্ঞতা, এমনকি সময়ের প্রবাহ, এসবই সেই বৃহত্তর চেতনা–ক্ষেত্রের প্রকাশ। অর্থাৎ আমরা যে বিশ্বকে কঠিন ও বস্তুগত বলে মনে করি, তা হতে পারে গভীরতর এক স্তরের প্রতিফলন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু দর্শনের নয়, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভাষায় নির্মিত। স্ট্রোমের মতে, টেলিপ্যাথি বা নিকট-মৃত্যু অভিজ্ঞতার মতো বিতর্কিত ঘটনাগুলোকে অস্বীকার না করে বৈজ্ঞানিক কাঠামোর ভেতরে ব্যাখ্যার চেষ্টা করা উচিত। যদি সব চেতনা একটি সমন্বিত ক্ষেত্রের অংশ হয়, তবে অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত অভিজ্ঞতাগুলিও নতুনভাবে বোঝা সম্ভব।

ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—একসময় মানুষ বিশ্বাস করত পৃথিবী সমতল, কিংবা সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব সেই ধারণাগুলো পাল্টে দিয়েছে। স্ট্রোমের মতে, বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়েও আমরা হয়তো আরেকটি বৈপ্লবিক মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আইনস্টাইন, শ্রোয়েডিঙ্গার, হাইজেনবার্গ ও প্ল্যাঙ্কের মতো পদার্থবিদেরা চেতনার গভীর প্রশ্নে যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাঁর কাজ সেই অনুসন্ধানেরই সম্প্রসারণ।

তাঁর তত্ত্বের আরেকটি সাহসী দিক হলো—ব্যক্তিগত চেতনা মৃত্যুর সঙ্গে সম্পূর্ণ বিলীন হয় না; বরং বৃহত্তর চেতনা–ক্ষেত্রে ফিরে যায়। যদিও এই ভাবনা ধর্মীয় দর্শনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, স্ট্রোম তা উপস্থাপন করেছেন কঠোর গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়।

সব মিলিয়ে, এটি আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের সংযোগস্থলে দাঁড়ানো এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা, যা প্রমাণিত হলে বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ধারণায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিজ্ঞান হয়তো নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে। তবে এ নিয়ে প্রচুর ভিন্ন মত আছে, বলাই বাহুল্য।

 

সূত্র: “Universal consciousness as foundational field: A theoretical bridge between quantum physics and non-dual philosophy” by Maria Strømme, 13th November 2025, published in AIP Advances.

DOI: 10.1063/5.0290984

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − 4 =