যুক্তরাজ্যের একটি নতুন সমীক্ষা প্রশ্ন হেঁকেছে : ভুয়ো তথ্য ও বিজ্ঞানবিরোধী নানা দাবি যখন ওঠে সেই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানীদের ওপর কতটা বিশ্বাস রাখেন ? কিংস কলেজ লন্ডনের পলিসি ইনস্টিটিউট ও সেন্স অ্যাবাউট সায়েন্সের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে ব্রিটেনের মানুষের বিজ্ঞানীদের প্রতি আস্থা এখনও যথেষ্ট বেশি। ৪,২৬২ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৬৩ শতাংশ বিজ্ঞানীদের প্রতি ০–১০-এর মাপকাঠিতে ৭ বা তার বেশি নম্বর দিয়ে উচ্চ আস্থা প্রকাশ করেছেন। মাত্র ৫ শতাংশ তাঁদের আস্থার মাত্রা ৩ বা তার নীচে রেখেছেন।
তবে বিজ্ঞানীদের প্রতি জনসাধারণের আস্থা শুধু তাঁদের বৈজ্ঞানিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- বিজ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও উদ্বেগের পাশে আছেন কি না এবং তাঁদের কাজকর্ম কতটা স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত। দেখা গেছে, সমাজের কল্যাণে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন, এই ধারণার প্রতি মানুষের আস্থা ছিল ১২ শতাংশ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পাশে আছেন, এই অনুভূতির প্রতি আস্থা ছিল ২১ শতাংশ। গবেষক ববি ডাফির মতে, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে মানুষের ভাবনার ক্ষেত্রটা খুবই সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তাদের এখন মূল ভাবনা মূল চিন্তা, বৈজ্ঞানিক কাজের সঙ্গে তাদের নিজেদের জীবনের কী সম্পর্ক? এতে তাদের ব্যক্তিগত উপকারের পাল্লাখানা কতটা ভারী?
সব ক্ষেত্রের বিজ্ঞানীদের প্রতি আস্থার মাত্রাও অবশ্য সমান নয়। ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত গবেষকদের প্রতি আস্থা সবচেয়ে বেশি, অন্যদিকে টিকা, মহাকাশ ও জলবায়ুবিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে আস্থা তুলনামূলকভাবে কম। আবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের তুলনায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীদের প্রতি আস্থা কম। কম আস্থার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, টিকা এবং 5G প্রযুক্তি নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য রয়েছে। টিকা আবিষ্কারক বিজ্ঞানীদের প্রতি কম আস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মাত্র ১৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা কেবল চিকিৎসকের পরামর্শে সুপারিশ করা টিকাই নেবেন। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজনও গুরুত্বপূর্ণ। বামঘেঁষা উত্তরদাতাদের ৮৭ শতাংশের বিজ্ঞানীদের প্রতি উচ্চ আস্থা আছে, কিন্তু অন্য দলের উত্তরদাতাদের ক্ষেত্রে তা ৫৫ শতাংশ।
তবে আস্থা বাড়ানোর সম্ভাব্য পথও রয়েছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মতে, বিজ্ঞানীরা ভুয়ো তথ্য সক্রিয়ভাবে সংশোধন করলে (৪৫%), তাঁদের গবেষণা কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে উন্নত করে তা ব্যাখ্যা করলে (৪৪%) এবং বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অনিশ্চয়তাগুলি স্পষ্টভাবে তুলে ধরলে (৩১%)— বিজ্ঞানীদের প্রতি আস্থা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গেও এই ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৬৮টি দেশের প্রায় ৭২,০০০ মানুষের ওপর করা আগের এক গবেষণায় বিজ্ঞানের প্রতি গড় আস্থা ছিল ৫-এর মধ্যে ৩.৬। এই গবেষণার ইঙ্গিত, মানুষের বাস্তব জীবন ও স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে বিজ্ঞানকে যুক্ত করে স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও প্রমাণনির্ভর যোগাযোগ তৈরি করা গেলে বিজ্ঞানীদের প্রতি মানুষের আশা ভরসা আরও বাড়বে।
সূত্র: https://www.nature.com/articles/d41586-026-02883-w
