বিবর্তন ও মানুষের একগামিতা

বিবর্তন ও মানুষের একগামিতা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবেই একগামী? নাকি একাধিক সঙ্গী ও বৈচিত্র্যময় যৌন সম্পর্ক মানুষের বিবর্তনের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার? এই প্রশ্ন নতুন নয় । নৃ-তত্ত্বের নথি বলছে, মানব ইতিহাসে প্রায় ৮৫ শতাংশ সমাজেই পুরুষদের একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমোদন ছিল । বহু কৃষ্টি, বহু সহস্রাব্দ ধরে মানুষ কখনও কঠোর একগামিতায় বাঁধা পড়েনি। কিন্তু বিবর্তনের দীর্ঘ ছকের দিকে তাকালে ছবিটা একটু আলাদা। কিছু গবেষকের মতে, হোমো স্যাপিয়েন্সের সাফল্যের পেছনে একগামিতাই ছিল নীরব চালিকাশক্তি। একগামী সম্পর্ক সামাজিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে, গোষ্ঠীকে করেছে আরও স্থিতিশীল। এই ধারণার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে অন্যান্য প্রাণীর উপর গবেষণাও। স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, এমনকি কিছু কীটপতঙ্গের মধ্যেও দেখা যায়, যেসব প্রজাতি একগামী, তাদের মধ্যে ‘কো-অপারেটিভ ব্রিডিং’ বা সমবায়ী সন্তানপালন বেশি । অর্থাৎ, শুধু মা-বাবা নয়, গোটা গোষ্ঠী মিলেই সন্তানের যত্ন নেয়। কিন্তু মানুষ আসলে কতটা একগামী ছিল? কল্পনা নয়, তথ্য দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনী নৃ-তত্ত্ববিদ মার্ক ডাইবল। তিনি একত্র করেছেন বিশ্বের ১০৩টি মানব সমাজ থেকে, ৭,০০০ বছরের জেনেটিক ও নৃ-তাত্ত্বিক তথ্য। তুলনার জন্য আরও ৩৪টি স্তন্যপায়ী প্রজাতির জেনেটিক তথ্য নিয়েছেন । লক্ষ্য একটাই, ইতিহাস জুড়ে আপন ভাইবোন (একই বাবা-মায়ের সন্তান) আর সৎ ভাইবোনের (একই মা কিংবা বাবার সন্তান) অনুপাত বোঝা । কারণটা সহজ। একগামী সমাজে আপন ভাইবোনের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা, আর বহুগামী বা অবাধ যৌন ব্যবস্থায় সৎ ভাইবোনের অনুপাত বেশি । এই সূচককে ভিত্তি করে ডাইবল প্রতিটি প্রজাতির জন্য হিসেব করেছেন এক ধরনের “একগামিতা হার”। এই পদ্ধতিকে তিনি নিজেই বলেছেন, “তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সরাসরি প্রাসঙ্গিক, অথচ আশ্চর্যজনকভাবে উপেক্ষিত।“ গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে প্রসিডিংস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি জার্নালে। দেখা যাচ্ছে, একগামিতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার ডিয়ার মাউস । যেখানে প্রায় ১০০ শতাংশ ভাইবোনই আপন ভাইবোন। মানুষের অবস্থান সেখানে সপ্তম । মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ৬৬ শতাংশ ভাইবোন আপন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে । এই সংখ্যা ইউরেশীয় বড় ইঁদুর অর্থাৎ বিভারের পরে। আর তার উপরেই আছে সাদা-হাত ওয়ালা গিবন। ডাইবল মজা করে একে তুলনা করেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগের সঙ্গে। তাঁর কথায়, “একগামিতার এক ধরনের প্রিমিয়ার লিগ আছে, যেখানে মানুষ স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নিয়েছে। আর অধিকাংশ স্তন্যপায়ী অনেক বেশি অবাধ বা বহুগামী কৌশল অনুসরণ করেছে।“ ইতিহাস জুড়ে বিবাহ ও যৌন আচরণে যত বৈচিত্র্যই থাকুক, মানুষ গোষ্ঠী হিসেবে বেশিরভাগ প্রাণীর তুলনায় বেশি একগামী। লক্ষ্য করার মতন বিষয়, আমাদের নিকটাত্মীয় প্রাইমেটরা কিন্তু তালিকার প্রায় নীচের দিকেই। ম্যাকাক বানর থেকে শুরু করে সাধারণ শিম্পাঞ্জি সবাই। তবে মানুষের একগামিতার ধরন অন্য একগামী প্রাণীদের মতো নয়। মানুষ একসঙ্গে অনেক বাচ্চা জন্ম দেয় না। আবার আমাদের সামাজিক গোষ্ঠীতে একাধিক নারী একসঙ্গে সন্তান প্রতিপালন করে। ডাইবলের ধারণা, মানুষের একগামিতার জন্ম হয়েছে এক ধরনের অ-একগামী, গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের ভেতর থেকেই। এটা প্রাণীজগতে তুলনামূলকভাবে বিরল এক বিবর্তনী রূপান্তর । সম্ভবত, মানুষের উপর এমন কিছু চাপ কাজ করেছে যা অন্য প্রজাতির ক্ষেত্রে ছিল না। ডাইবল স্বীকার করেন, এই গবেষণা একটা মোটামুটি হিসেব। পৃথিবীর অসংখ্য প্রজাতির সামান্য অংশই এতে ধরা পড়েছে। তবু তাঁর বিশ্বাস, তথ্যগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে একগামী জীবনধারা মানব বিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বড় পরিবার, বিস্তৃত আত্মীয়, আর সেখান থেকেই গড়ে ওঠা বৃহৎ সমাজ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পথ। আর এই সব কিছুর প্রথম ধাপ ছিল, সামাজিক কাঠামোই। সম্ভবত, সেখানেই লুকিয়ে আছে ‘মানুষ’ নামের প্রজাতির সাফল্যের আসল গল্প।

 

সূত্র: Nautilus Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 16 =