আজ বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি হৃদরোগ, ক্যানসার এবং হাড় ও পেশির রোগকে ছাড়িয়ে অক্ষমতার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডি ২০২৩-এর নতুন বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে , বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিবর্তন শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক পরিসংখ্যানগত তথ্য নয়; এটি আধুনিক সমাজের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মানসিক রোগ বিশ্বব্যাপী অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকার মোট বছরের ১৭ শতাংশেরও বেশি অংশের জন্য দায়ী ছিল। এছাড়া এসব রোগের কারণে প্রায় ১৭১ মিলিয়ন সম্পূর্ণ সুস্থ জীবৎকাল হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ, অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর কারণে মানুষের সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবনের বিপুল পরিমাণ সময় নষ্ট হয়েছে। এর ফলে মানসিক রোগ এখন বিশ্বে সামগ্রিক রোগের বোঝার পঞ্চম বৃহত্তম কারণ।
এই বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে উদ্বেগজনিত রোগ এবং গভীর বিষণ্ণতার। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর এই দুই ধরনের মানসিক সমস্যার প্রকোপ দ্রুত বেড়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে উদ্বেগজনিত রোগের হার ৪৭ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, আর বড় ধরনের বিষণ্নতার হার বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। মহামারির সময় দীর্ঘ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রিয়জন হারানোর শোক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাতটা গিয়ে পড়ছে তরুণদের ওপর। গবেষণা অনুযায়ী, মানসিক রোগের বোঝা সবচেয়ে বেশি ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। এটি জীবনের এমন একটি সময়, যখন মানুষ নিজের পরিচয় গড়ে তোলে, শিক্ষা ও কর্মজীবনের ভিত্তি নির্মাণ করে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। ফলে এই বয়সে মানসিক সমস্যার প্রভাব সাময়িক নয়, সারা জীবনের সম্ভাবনা ও সুযোগকেও স্তিমিত করে দিতে পারে।
আবার, দেখা গেছে নারীরাই এই সংকটের ভার বেশি বহন করছেন। বর্তমানে প্রায় ৬২ কোটি নারী মানসিক রোগে আক্রান্ত, যেখানে আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৫৫ কোটি ২০ লাখ। গবেষকেরা মনে করেন, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, পরিবার ও সন্তানের যত্নের অতিরিক্ত দায়িত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রভৃতি কারণগুলো এই পার্থক্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যপরিসেবা এখনও অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তা পান না। ফলে অসংখ্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাহীন অবস্থায় ভুগেই চলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য, সহিংসতা এবং মানসিক আঘাতের মূল কারণগুলোকেও মোকাবিলা করতে হবে। প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জরুরি বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে এর মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকে এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা বলা যায় না। এটি একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক মাশুল আগামী দশকগুলোতে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। আজকের পৃথিবীতে সুস্থ সমাজ গড়তে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের সমান গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র: Global Burden of Disease Study, The Lancet / IHME, 2026
