পশ্চিমী সমাজে ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ শব্দটি এখন আকছার শোনা যায়। পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে অফিসের পাওয়ার-পলিটিক্স, এমনকি বাসন মাজতে অনীহা, সবকিছুর গায়েই এই লেবেল সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা হল, বাস্তবে কি অধিকাংশ পুরুষই ‘টক্সিক’? নাকি এই শব্দটি ক্রমশ এক ‘অলস ব্যাখ্যায়’ পরিণত হচ্ছে? নিউজিল্যান্ডে একটি বড় মাপের গবেষণা এই বিতর্কে একরকম ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছে। তথ্য বলছে, পুরুষদের মধ্যে প্রকৃত অর্থে ‘চরম বিষাক্ত’ আচরণ করা মানুষের সংখ্যা কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কম। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, নিজেকে ‘পুরুষালি’ ভাবার আকাঙ্ক্ষা মানেই সামাজিকভাবে ক্ষতিকর মানসিকতা- এরূপ সরল সমীকরণ বিজ্ঞান মানছে না। বিষাক্ত পুরুষত্ব বা ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ শব্দটির জন্ম আশির দশকে। ধারণাটি ছিল, সামাজিকভাবে আদর্শ বলে ধরে নেওয়া কিছু ‘পুরুষালি’ বৈশিষ্ট্য, যেমন- আগ্রাসন, কর্তৃত্ব, আবেগ চেপে রাখা, আসলে সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই ধারণার নিঃসন্দেহে দরকার ছিল। এটি দেখিয়েছে পুরুষদের উপর চাপানো লিঙ্গ-প্রত্যাশা কীভাবে তাদের ঠেলে দিতে পারে বিষণ্নতা, আবেগগত বিচ্ছিন্নতা এবং সহিংসতার দিকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দটি অতিরিক্ত প্রসারিত হয়েছে। এখন প্রায় সব ধরনের সমস্যাজনক পুরুষ আচরণকেই ‘টক্সিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, এখানেই সমস্যা। এই শব্দের ঢিলেঢালা ব্যবহার এমন ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে যে সব সমাজেই বুঝি ‘পুরুষত্ব’ একরকম, সব পুরুষালি বৈশিষ্ট্যই বুঝি খারাপ, আর শেষ পর্যন্ত সব পুরুষই কোনও না কোনও ভাবে বিষাক্ত। আশ্চর্যের বিষয়, এত আলোচিত একটি ধারণা হওয়া সত্ত্বেও ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’-র নির্ভুল বৈজ্ঞানিক মাপজোখ খুব বেশি ছিল না। “আসলে কেউই এটাকে ঠিকমতো মাপেনি,” বলছেন ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন স্যান্ডার্স। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মনোবিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে ভেঙে, আলাদা আলাদা উপাদানে ভাগ করে পরিমাপ করার চেষ্টা করছেন। ২০২৪ সালে স্যান্ডার্স ও তাঁর সহকর্মীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ছাত্রদের উপর ভিত্তি করে একটি ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি স্কেল’ তৈরি করেন। এবার সেই কাজকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিয়ে গেছেন নিউ জিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেবোরা হিল কোন। ‘Psychology of Men & Masculinities’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় পশ্চিম সমাজের প্রাপ্তবয়স্ক, অ-সমকামী পুরুষদের একটি বিশাল নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’-র আটটি সূচক চিহ্নিত করেন।
যার মধ্যে রয়েছে-
১. যৌন ও লিঙ্গ-পরিচয়ের প্রতি বিদ্বেষ,
২. নিজের সত্তার কেন্দ্রে ‘লিঙ্গ-পরিচয়’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ,
৩. শত্রুতামূলক ও তথাকথিত ‘সহানুভূতিহীন’ যৌনবৈষম্য,
৪.গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধে বিরোধিতা, এবং
৫.সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে বিশ্বাস।
এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে ২০১৮–১৯ সালের ‘New Zealand Attitudes and Values Study’–এর তথ্যের উপর ভিত্তি করে। যেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের উত্তর ছিল। ফলাফল? পুরুষদের পাঁচটি আলাদা গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়। মাত্র ৩.২ শতাংশ পড়েছে ‘হোস্টাইল টক্সিক’ বা চরম বিষাক্ত দলে। বিপরীতে, সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী ৩৫.৪ শতাংশ প্রায় সম্পূর্ণ ‘অবিষাক্ত’। মাঝখানে রয়েছে তুলনামূলকভাবে সহনশীল বা ‘সহৃদয় বিষাক্ত ’ গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে প্রকাশ্য শত্রুতা কম, কিন্তু লিঙ্গ-স্টেরিওটাইপ প্রবল। “গড়পড়তা পুরুষরা দানব নয়,” স্যান্ডার্সের সোজাসাপ্টা মন্তব্য। এই গোষ্ঠীর পুরুষরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে বয়স্ক, একা, বেকার, কম শিক্ষিত, অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত বা সামাজিকভাবে প্রান্তিক। “এরা দামী গাড়ি চালানো পুরুষ নন,” বলছেন হিল কোন। “ যাদের হাতে খুব কম সম্পদ।“ আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, অনেক ‘পুরুষালি’ পুরুষই একেবারে বিষাক্ত নন। হিল কোনের ভাষায়, “সদর্থক পুরুষত্ব বলে একটা জিনিস আছে।“ প্রতিযোগিতা, দৃঢ়তা বা নেতৃত্ব প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য তো স্বভাবত খারাপ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন লিঙ্গ-পরিচয় হয়ে ওঠে অনমনীয় একটা খাঁচা। যখন একজন পুরুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে দুর্বলতা দেখানো, আবেগ প্রকাশ করা বা সাহায্য চাওয়াটা ‘অপুরুষোচিত’। তখনই বাড়ে মাদকাসক্তি, মানসিক বিপর্যয়, এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকি। বিজ্ঞান তাই একটাই কথা বলছে, ‘বিষাক্ত পুরুষত্ব’ কোনও একরঙা দানব নয়। এ এক সামাজিক ও মানসিক জটিলতা, যাকে বুঝতে হলে স্লোগান নয়, দরকার তথ্য, সূক্ষ্ম বিচার এবং সংযম।
সূত্রঃ Can ‘toxic masculinity’ be measured? Scientists try to quantify controversial term; Nature; January 2026
