যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ছিলেন এক বর্নময় ব্যক্তিত্ব। ইনি একই সঙ্গে ছিলেন বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, কূটনীতিক, লেখক এবং রাষ্ট্রনায়ক। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের নাম উচ্চারিত হলেই যে ঘটনার কথা সবার আগে মনে আসে, তা হলো তাঁর সেই বিখ্যাত ঘুড়ি পরীক্ষা। এতদিন ধরে পাঠ্যপুস্তক, জনপ্রিয় বিজ্ঞানগ্রন্থ এবং লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে ১৭৫২ সালে তিনি ঝড়ের মধ্যে একটি ঘুড়ি উড়িয়ে সরাসরি বজ্রপাতের শক্তিকে বন্দী করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে বজ্রপাত আসলে বিদ্যুৎ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঘটনাটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে প্রচারিত হয়ে আসছে। এই গল্পটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়ও বটে, তবে আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে, জনপ্রিয় এই গল্পের অনেক অংশই পুরোপুরি সঠিক নয়।
১৭৫২ সালের ১০ই জুন ফিলাডেলফিয়ায় এক পড়ন্ত বিকেলে, আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা, ফ্র্যাঙ্কলিন তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে উইলিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ঝড়ের মেঘে বিদ্যমান বৈদ্যুতিক চার্জের উপস্থিতি শনাক্ত করা। জনপ্রিয় কাহিনিতে বলা হয়, ঘুড়ির মাথায় একটি ধাতব দণ্ড লাগানো ছিল এবং তার সুতোয় একটি ধাতব চাবি বাঁধা ছিল। বলা হয়, বজ্রপাত সরাসরি ঘুড়িতে আঘাত করে, বিদ্যুৎ সুতোর মাধ্যমে নীচে নেমে আসে এবং চাবিতে বিদ্যুতের ঝলক দেখা যায়। এই ঘটনাই নাকি প্রমাণ করেছিল যে বজ্রপাত আসলে এক ধরনের বৈদ্যুতিক ঘটনা।
কিন্তু বাস্তবে যদি সত্যিই সরাসরি ঘুড়িটিতে বজ্রাঘাত হত, তবে ফ্র্যাঙ্কলিনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ছিল না বললেই চলে। বজ্রপাতের শক্তি কয়েক কোটি ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে এবং এর তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি। এমন একটি বৈদ্যুতিক স্রোত যদি ঘুড়ির মাধ্যমে নীচে নেমে আসত, তবে ফ্র্যাঙ্কলিন মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ হারাতেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনি শুধু জীবিতই ছিলেন না, বরং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র সম্পাদনা, সংবিধানে স্বাক্ষর কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন এবং রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। ফলে গবেষকদের মতে, তাঁর ঘুড়িতে সরাসরি বজ্রাঘাত হয়নি এটা একদম নিশ্চিত।
প্রকৃতপক্ষে ফ্র্যাঙ্কলিনের পরীক্ষার আসল বিবরণ কিছুটা ভিন্নগোত্রীয়। ইংরেজ রসায়নবিদ জোসেফ প্রিস্টলি, সরাসরি ফ্র্যাঙ্কলিনের কাছ থেকে তাঁর পরীক্ষার বিবরণ শুনেছিলেন। ফ্র্যাঙ্কলিনের পরীক্ষাটি ছিল মূলত বায়ুমণ্ডলীয় বিদ্যুৎ সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের একটি সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা। জোসেফ প্রিস্টলির বর্ণনা অনুযায়ী, ধাতব চাবির নীচে একটি রেশমি ফিতা বা সিল্কের অংশ যুক্ত ছিল। এই সিল্ক বিদ্যুতের অপরিবাহী হওয়ায় তা নিরোধক হিসেবে কাজ করেছে এবং ফ্র্যাঙ্কলিনকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। ফ্র্যাঙ্কলিন চাবি বা ভেজা সুতোর পরিবর্তে এই রেশমি অংশটি ধরে ছিলেন।
ঝড়ের মধ্যে ঘুড়ি উড়ানোর সময় ফ্র্যাঙ্কলিন ও তাঁর ছেলে একটি খোলা ছাউনির নীচে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি লক্ষ্য করেন, ভেজা শণের সুতোর সূক্ষ্ম তন্তুগুলো একে অপরকে বিকর্ষণ করছে। এই আচরণ স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে সুতোর মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়েছে। অর্থাৎ, ঘুড়িটি বজ্রপাতের সরাসরি আঘাত না পেলেও ঝড়ো মেঘের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র থেকে চার্জ সংগ্রহ করেছিল।
পরবর্তী ধাপে তিনি ধাতব চাবির মাধ্যমে সেই চার্জ একটি বিশেষভাবে নির্মিত পাত্রে বা লেইডেন জারে স্থানান্তর করেন। লেইডেন জার ছিল তৎকালীন যুগের এক ধরনের প্রাথমিক বৈদ্যুতিক ধারক, যা বিদ্যুৎ জমা রাখত । এরফলে ফ্র্যাঙ্কলিন সরাসরি বজ্রপাত ধরতে না পারলেও তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে ঝোড়ো মেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ বিদ্যমান এবং বজ্রপাতের সঙ্গে বিদ্যুতের একটা সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ইতিহাসের আরেকটি কম আলোচিত তথ্য হলো, ফ্র্যাঙ্কলিন সম্ভবত এই ধরনের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা প্রথম ব্যক্তি ছিলেন না। ১৭৫০ সালে তিনি মেঘ থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন এবং সেই ধারণা তাঁর ফরাসি বন্ধু ও পদার্থবিদ টমাস-ফ্রাঁসোয়া ডালিবার্ডের সঙ্গেও ভাগ করে নেন।
ফ্র্যাঙ্কলিনের পরিকল্পনা অনুসরণ করে ডালিবার্ড ফ্রান্সে একটি প্রায় ৪০ ফুট উঁচু ধাতব দণ্ড স্থাপন করেন। ১৭৫২ সালের ১০ মে অর্থাৎ ফ্র্যাঙ্কলিনের ঘুড়ি পরীক্ষার এক মাস আগে তিনি সফলভাবে মেঘ থেকে বৈদ্যুতিক আধান সংগ্রহ করেন। ধাতব দণ্ডটিকে নিরোধক হিসেবে ওয়াইনের কাচের বোতলের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। এই পরীক্ষাটির দ্বারাই প্রথম প্রমাণিত হয় যে বায়ুমণ্ডলের মেঘে বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চিত থাকে।
তবুও ইতিহাসে ডালিবার্ডের চেয়ে ফ্র্যাঙ্কলিনের নামই বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে। বৈজ্ঞানিক অগ্রাধিকারের বিচারে ডালিবার্ড হয়তো প্রথম সফল পরীক্ষক ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর নাম তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে গেছে। কারণ, মানুষের মনে একটি ধাতব দণ্ড ব্যবহার করে চার্জ সংগ্রহের চেয়ে ঝড়ের মধ্যে ঘুড়ি উড়িয়ে আকাশের শক্তিকে বোঝার প্রচেষ্টা অনেক বেশি স্মরণীয় থেকে গেছে। ফ্র্যাঙ্কলিনের পরীক্ষার এই মানবিক ও সাহসী দিকই তাকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেছে।
তবে এই পরীক্ষা পরিচালনার বিপদও ছিল মারাত্মক। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের কয়েকজন গবেষক ফ্র্যাঙ্কলিনের পরীক্ষার অনুকরণ করতে গিয়ে প্রাণ হারান। তাঁরা সরাসরি বায়ুমণ্ডলীয় বিদ্যুৎ সংগ্রহের চেষ্টা করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। ফ্র্যাঙ্কলিনের পরীক্ষা যতটা রোমাঞ্চকর ছিল, ততটাই বিপজ্জনকও ছিল। এবং এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে অষ্টাদশ শতকের বিজ্ঞানচর্চা কেবল কৌতূহল ও উদ্ভাবনের নয়, ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণেরও এক অসাধারণ উদাহরণ ছিল।
বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের ঘুড়ি পরীক্ষা নিয়ে প্রচলিত গল্প পুরোপুরি সত্য না হলেও এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি বজ্রপাতকে সরাসরি ধরেননি ঠিকই, কিন্তু বায়ুমণ্ডলীয় বিদ্যুতের অস্তিত্ব ও বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই গবেষণাই পরবর্তীকালে বজ্রনিরোধক বা লাইটনিং রডের আবিষ্কারসহ বিদ্যুৎবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পরে অসংখ্য বহুতল অট্টালিকা, জাহাজ এবং মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।
বিজ্ঞান ও ইতিহাসের এই অনন্য অধ্যায় আজও মানব কৌতূহল, সাহস এবং অনুসন্ধিৎসু মননের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
