ভবিষ্যতের মহামারি কোন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য—এই প্রশ্নের যথাযোগ্য উত্তর দিতে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন একটি নতুন বৈশ্বিক রোগঝুঁকি মানচিত্র। উপগ্রহর পর্যবেক্ষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে পরিচালিত এই গবেষণা জানাচ্ছে, পৃথিবীর প্রায় ৯.৩ শতাংশ স্থলভাগ বিপজ্জনক সংক্রামক রোগের উচ্চ বা অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব অঞ্চল প্রধানত লাতিন আমেরিকা ও ওশেনিয়ায় কেন্দ্রীভূত, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমি-ব্যবহারের দ্রুত রূপান্তর ইতিমধ্যেই মানবস্বাস্থ্যকে চাপে ফেলছে।
ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের পশুচিকিৎসা সংক্রান্ত মহামারি বিশেষজ্ঞ অ্যাঞ্জেলা ফানেলির নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রায় সব দেশের মহামারি-প্রবণ রোগের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফল অনুযায়ী, বৈশ্বিক স্থলভাগের ৬.৩ শতাংশ এলাকা উচ্চ ঝুঁকিতে এবং আরও ৩ শতাংশ এলাকা অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে শ্রেণিবদ্ধ। জনসংখ্যার হিসেবে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ মাঝারি ঝুঁকির অঞ্চলে বাস করেন, যেখানে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দ্রুত অচল হয়ে পড়তে পারে।
এই মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ রোগই জুনোটিক, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের উদ্ভূত নতুন সংক্রামক রোগের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই প্রাণী উৎস থেকে আসে। বনভূমিতে মানুষের অনুপ্রবেশ, বন্যপ্রাণীর বাজার এবং ঘন জনবসতি—এসবই প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাসের লাফ দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
সেইসাথে জলবায়ু পরিবর্তন এই বিপদকে আরও তীব্র করছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ খরার মতো চরম আবহাওয়া প্রাণী, পোকামাকড় ও ভাইরাসের বিস্তারক্ষেত্র বদলে দিচ্ছে। ফলে মশা -বাহিত রোগগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক দূরের ও ঠান্ডা অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
মানচিত্রটি শুধু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাই চিহ্নিত করে না, কোন দেশগুলো প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে কম প্রস্তুত, সেটিও দেখায়। পাপুয়া নিউ গিনি বা কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে রোগঝুঁকি বেশি, কিন্তু স্বাস্থ্য পরিকাঠামো দুর্বল। বিপরীতে, অনেক ধনী দেশে ঝুঁকি কম, কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বেশি। হয়তো এরা ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও গবেষণার কেন্দ্র হতে পারে।
এই মানচিত্র মূলত একটি কৌশলগত সতর্কতা। এটি দেখিয়ে দেয়, মহামারি মোকাবিলায় সফলতা নির্ভর করে শুধু চিকিৎসার সুবিধার ওপর নয় – আগাম নজরদারি, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর। ভবিষ্যৎ মহামারি কোথায় শুরু হবে তা আগে থেকে হয়তো বলা সম্ভব হবে না , কিন্তু প্রস্তুতির অভাবই সেটিকে বৈশ্বিক সংকটে রূপ দিতে পারে।
সূত্র: Assessing the risk of diseases with epidemic and pandemic potential in a changing world by Angela Fanelli , Alessandro Cescatti, et.al; published in the journal Science Advances, 23 Jul 2025
Vol 11, Issue 30, DOI: 10.1126/sciadv.adw6363
