ব্যাকটেরিয়ার তৈরি প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন

ব্যাকটেরিয়ার তৈরি প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ জানুয়ারী, ২০২৬

রোদ থেকে বাঁচতে মানুষ সানস্ক্রিন মাখে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু জীব আছে, যারা কোটি কোটি বছর ধরে কোনো কেমিক্যাল লোশন ছাড়াই সূর্যের তীব্র আলো সহ্য করে বেঁচে আছে। গরম জলধারায় বসবাসকারী এক ধরনের সায়ানোব্যাকটেরিয়া সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য একটি বিশেষ প্রাকৃতিক রাসায়নিক তৈরি করে। এই রাসায়নিকটি কার্যত একটি প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন। ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে থাইল্যান্ডের উষ্ণ প্রস্রবণে। যেখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি, সূর্যালোক তীব্র এবং পরিবেশ অত্যন্ত কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্যই তারা বিবর্তনের পথে গড়ে তুলেছে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা। গবেষকরা যে যৌগটি খুঁজে পেয়েছেন, তার নাম গ্লুকোজ-আবদ্ধ হাইড্রক্সি মাইকোস্পোরিন-সারকোসিন GlcHMS326। নাম জটিল হলেও, এর কাজ খুব সহজভাবে বোঝা যায়। এই অণু সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে নেয় এবং কোষের ভিতরে ক্ষতি করতে দেয় না।

অতিবেগুনি রশ্মি আমাদের ত্বকের জন্য বিপজ্জনক। এটি ত্বকের কোষে ক্ষত তৈরি করে, ডিএনএ নষ্ট করতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়লে ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই মানুষ সানস্ক্রিন ব্যবহার করে। কিন্তু অনেক সানস্ক্রিনেই এমন রাসায়নিক থাকে যা ত্বকের বা পরিবেশের ক্ষতি করে। এই ব্যাকটেরিয়ার তৈরি যৌগটি সেই দিক থেকে আলাদা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রাকৃতিক যৌগটি, UV-A এবং UV-B দু’ধরনের রশ্মিই শোষণ করতে পারে। এটি কোষের ভিতরের ক্ষতিকর অক্সিজেন কণাকে নিষ্ক্রিয় করে, যা ত্বকের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এমনকি পরিবেশের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ, এটি শুধু সূর্যের আলো আটকায় না, কোষকে ভিতর থেকেই রক্ষা করে। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রাকৃতিক যৌগ ব্যবহার করে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব সানস্ক্রিন তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। আসলে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে এমন কিছু বিশেষ জিন রয়েছে, যেগুলি সূর্যের আলো পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতিবেগুনি রশ্মি যত বাড়ে, এই জিনগুলো তত বেশি করে এই সুরক্ষামূলক অণু তৈরি করে। এ যেন ব্যাকটেরিয়ার শরীরের ভেতরে বসানো এক স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রোদ বাড়লে তার ঢাল মোটা হয়। এই গবেষণা দেখাচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই কত উন্নত সমাধান তৈরি করতে পারে। চরম পরিবেশে টিকে থাকা জীবদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শেখা যায়। জীবাণুদের ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক উৎপাদন সম্ভব। গবেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে বড় মাত্রায় এই যৌগ তৈরি করা যাবে। তখন তা প্রসাধনী, ওষুধ এমনকি অতিবেগুনি-প্রতিরোধী উপকরণ তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে। সূর্যের নীচে টিকে থাকা একটি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির সব উত্তর ল্যাবরেটরিতে নয়, অনেক সময় প্রকৃতির গভীর কোণে লুকিয়ে থাকে। মানুষ যেখানে কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজে, সেখানে প্রকৃতি বহু আগেই তার নিজস্ব সমাধান বানিয়ে রেখে দিয়েছে।

 

সূত্র: Discovery of a novel natural sunscreen from thermophilic cyanobacteria with a potentially unique biosynthetic pathway and its transcriptional response to environmental stresses. Science of The Total Environment, 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 3 =