ব্র্যাগের সূত্র আধুনিক ক্রিস্টালোগ্রাফির অন্যতম মৌলিক ভিত। এই সূত্র থেকে আমরা জানতে পারি, কীভাবে এক্স- রশ্মি কোনো কেলাসের ভেতরের পারমাণবিক স্তরের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে বিশেষ ধরনের অপবর্তন নকশা বা সজ্জা তৈরি করে। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ এবং তাঁর বাবা উইলিয়াম হেনরি ব্র্যাগ এই সূত্রটি উদ্ভাবন করেন। তাঁদের এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের প্রথমবারের মতো পদার্থের ভেতরের পারমাণবিক বিন্যাস সরাসরি বিশ্লেষণ করার সুযোগ করে দেয়। ব্র্যাগের সূত্রের মূল সমীকরণ হলো nλ=2dsinθ । এই সমীকরণটিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাশি রয়েছে। এখানে n হলো প্রতিফলনের ক্রম বা order of reflection, λ (ল্যামডা) হলো এক্স-রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য, d হলো কেলাসের পারমাণবিক সমতলীয় স্তরগুলির ( ল্যাটিস প্লেন ) মধ্যবর্তী দূরত্ব, এবং θ (থিটা) হলো কেলাসের ওপর এক্স-রের আপতন কোণ। এই সূত্র অনুযায়ী, যখন প্রতিফলিত এক্স-রে তরঙ্গগুলোর পথের পার্থক্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পূর্ণসংখ্যার গুণিতক হয়, তখন আলোর গঠনের ব্যাতিচার ঘটে এবং স্পষ্ট অপবর্তন নকশা তৈরি হয়। অপবর্তন হল আলোর বেঁকে যাওয়ার ঘটনা।
আসলে কেলাসের ভেতরে পরমাণুগুলো খুব নিয়ম মাফিক স্তরে স্তরে সাজানো থাকে। যখন এক্স-রশ্মি সেই স্তরগুলোর ওপর এসে পড়ে, তখন রশ্মিগুলো বিভিন্ন দিকে প্রতিফলিত হয়। নির্দিষ্ট কোণে প্রতিফলিত এইসব তরঙ্গ একে অপরকে শক্তি যোগায়। সেই বিশেষ কোণ এবং অপবর্তন সজ্জা বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন কেলাসের ভেতরে পরমাণুগুলো কেমন ছাঁদে সাজানো রয়েছে।
ব্র্যাগের সূত্রের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো এটি পদার্থের অভ্যন্তরীণ গঠন নির্ণয়কে অনেক সহজ ও নির্ভুল করে তুলেছে। এই সূত্র ব্যবহার করে ধাতু, খনিজ, সিরামিক এবং বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের কেলাস কাঠামো বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে খুব সহজেই। এমনকি জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ডি এন এ-র জোড়া হেলিক্স/ দ্বিতন্ত্রী গঠন আবিষ্কারের পেছনেও এক্স-রে অপবর্তন প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
এই সূত্র আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার বিকাশে একপ্রকার যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছে। নতুন ধরনের ওষুধ তৈরি, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, ন্যানোমেটিরিয়াল তৈরি এবং উন্নত ইলেকট্রনিক উপাদান তৈরিতে এখনও ব্র্যাগের সূত্র ভিত্তিক এক্স-রে অপবর্তন একটি অপরিহার্য গবেষণা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত।
আজও বিজ্ঞানের গবেষণাগারে ব্র্যাগের সূত্র আগের মতনই শক্তিশালী হাতিয়ার। এ যে শুধু কেলাসের গঠন বুঝতেই সাহায্য করে তা নয়। পরমাণু ও অণুর জগত সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে এই পদ্ধতি আরও বিস্তৃত করেছে।
সূত্র: https://www.facebook.com/share/p/1JJpc3BpRZ/
