ভারতের জনসংখ্যা এখন কত? ১৪০ কোটি, ১৪৫ কোটি, নাকি ১৫০ কোটি? জন্মহার কমছে কি? কোন রাজ্যের জনসংখ্যা বাড়ছে? এই প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি আরও একটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ – মানুষকে কোথায় গণনা করা হচ্ছে? জনসংখ্যা তো শুধু জন্ম আর মৃত্যুর হিসাব নয়। এক জায়গার জনসংখ্যা বদলায়, মানুষের আসা-যাওয়ার কারণেও। গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে মানুষের যাত্রাই ভারতের দ্রুত নগরায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই ২০২৭ সালের জনগণনা শুধু দেশের মোট জনসংখ্যা জানার জন্য নয়, শহরগুলোর প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে শেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। তখন দেশের শহুরে জনসংখ্যা ছিল ৩৭ কোটি ৭১ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৩১.২ শতাংশ। এরপর কেটে গেছে ১৬ বছর। এই সময়ে দ্রুত বেড়েছে শহরমুখী অভিবাসন, শহরের বিস্তার, নতুন শিল্পাঞ্চল, নির্মাণকাজ এবং জলবায়ুজনিত কারণে মানুষের স্থানান্তর। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, ২০৩৬ সালের মধ্যে ভারতের শহরে থাকবে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ এবং দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশই চলবে শহরাঞ্চল থেকে।
তবে একটি শহরকে ‘শহর’ হিসেবে চিহ্নিত করা শুধু মানুষের সংখ্যার ওপরে নির্ভর করে না। ভারতে কোনও বসতিকে শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জনসংখ্যা, জনঘনত্ব এবং মানুষের পেশা প্রভৃতি নানা বিষয় বিবেচনা করা হয়। আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন অভিবাসী শ্রমিকরা। ওড়িশা, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বা ছত্তিশগড়ের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেঙ্গালুরু, মুম্বই, দিল্লি, সুরাট, হায়দরাবাদ কিংবা চেন্নাইয়ের মতো শহরে কাজ করেন। নির্মাণ, কারখানা, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা, গৃহস্থালি কাজ, হোটেল বা ডেলিভারি পরিষেবা – শহরের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান রয়েছে। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হল, অনেকের রেশন কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র বা অন্যান্য সরকারি নথি এখনও গ্রামের ঠিকানার সঙ্গেই যুক্ত। ফলে তাঁরা শহরে থাকলেও জনগণনায় গ্রামের বাসিন্দা হিসেবেই নথিভুক্ত হয়ে থাকেন। এতে দেশের মোট জনসংখ্যা বদলায় না, কিন্তু শহর ও গ্রামের প্রকৃত জনসংখ্যার চিত্র বিকৃত হয়ে যায়। এর প্রভাবও ব্যাপক। কোনও শহরে যদি কয়েক লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের সঠিক হিসাব না থাকে, তাহলে পানীয় জল, গণপরিবহন, হাসপাতাল, স্কুল, আবাসন, নিকাশি ব্যবস্থা বা তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনায় বড় ধরনের ভুল হতে পারে। ২০২৭ সালের জনগণনা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি হবে ভারতের প্রথম ডিজিটাল জনগণনা। মোবাইলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, জিও-রেফারেন্সড মানচিত্র এবং স্বেচ্ছায় অনলাইনে তথ্য দেওয়ার সুবিধা এতে থাকবে। একই সঙ্গে বহু দশক পর এবার বিস্তৃত জাতপাত সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি অভিবাসী শ্রমিকদের উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করতে পারেন, কর্মস্থলে গণনা হলে তাঁদের গ্রামের সামাজিক পরিচয়, সংরক্ষণ বা সরকারি সুবিধার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রামের ঠিকানায় নিজেদের নথিভুক্ত করতে চাইতে পারেন। যদি শহরে কর্মরত কয়েক কোটি মানুষকে গ্রামেই গণনা করা হয়, তাহলে ভারতের নগরায়নের হার কাগজে-কলমে উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখাতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের শহর পরিকল্পনাও ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়াতে পারে। তাই শুধু দেশের জনসংখ্যা কত, সেই প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। আরও বড় প্রশ্ন, যাঁরা ভারতের শহর গড়ছেন, জনগণনায় তাঁদের কি সঠিক জায়গায় গণনা করা হবে? কারণ উন্নত ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে, আজকের শহরগুলোকে যে শ্রমিকেরা প্রতিদিন গড়ে তুলছেন, তাঁদের উপস্থিতি সরকারি পরিসংখ্যানে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হওয়াই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রথম শর্ত।
সূত্র: Down to Earth ; July ; 2026
