গত দু’দশকে ভারতের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই কমেছে জন্মহার বা মোট প্রজনন হার (TFR)। বদলেছে পরিবার নিয়ে মানুষের ভাবনা। এখন অনেক দম্পতিই সন্তান না নেওয়া, কিংবা এক সন্তানের মধ্যেই পরিবার সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কারণ একাধিক। সন্তান বড় করার বাড়তি খরচ, পরিবেশের উপর জনসংখ্যার চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়েই বদলাচ্ছে সিদ্ধান্ত। তার উপর অস্থির বিশ্ব অর্থনীতি, একের পর এক যুদ্ধ এবং সংঘাতও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ, সন্তান নেওয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি, পরিবেশ এবং বিশ্ব পরিস্থিতিও। অন্যদিকে, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিও ভারতে প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে বড় ভূমিকা নিয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বেড়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ছবি সারা দেশে এক নয়। কিছু রাজ্যে জন্মহার নেমে গেছে প্রতিস্থাপন-স্তরের নীচে। আবার কিছু রাজ্যে সেই হার এখনও বেশ বেশি। কেন এই ফারাক? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণের দিকে তাকালে চলবে না। পিছিয়ে থাকা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, মহিলাদের কম শিক্ষা-হার, পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের সীমিত স্বাধীনতা – সবই এর সঙ্গে জড়িত। তার সঙ্গে রয়েছে দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবার অপ্রতুলতা। শহর-গ্রামের ছবিতেও তাই পার্থক্য স্পষ্ট। গ্রামে এখনও অনেক মহিলার শিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থান কম। কোথাও আবার পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজননস্বাস্থ্য পরিষেবা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই অপ্রতুল। স্বভাবতই শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় জন্মহার কমার গতি ধীর। তবে প্রশ্ন হল, জন্মনিয়ন্ত্রণের পুরো দায়িত্ব কি এখনও শুধু মহিলাদেরই? বাস্তবে অনেক পুরুষ এখনও মনে করেন, পরিবার পরিকল্পনা মানেই মহিলাদের বিষয়। তার সঙ্গে রয়েছে আরও কিছু পুরনো ভুল ধারণা। যেমন, গর্ভনিরোধক ব্যবহার করলে যৌনক্ষমতা কমে যাবে, যৌন আনন্দে ব্যাঘাত ঘটবে ইত্যাদি। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। তরুণ পুরুষদের মধ্যে প্রজননস্বাস্থ্য, গর্ভনিরোধ এবং লিঙ্গসমতা নিয়ে সঠিক স্বাস্থ্যশিক্ষা না বাড়ালে পরিবার পরিকল্পনার লক্ষ্য পুরোপুরি সফল হবে না। তবে জন্মহার কমছে বলে ভারতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তা কিন্তু নয়। বরং এটা একরকমের সুযোগ। ২০৫০ সাল পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যার একট বড় অংশ থাকবে তরুণ। আর তরুণদের সুস্বাস্থ্য, ভালো শিক্ষা এবং যথেষ্ট কর্মসংস্থানের সুযোগ, দেশের অর্থনীতির একটা বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। এটাই হল জনতাত্ত্বিক সুফল (‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’) । অবশ্য শুধু তরুণদের দিকে তাকালেই হবে না, মেয়েদের আরও বেশি শিক্ষা, কাজের সুযোগ এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে তবেই মিলবে লিঙ্গ-সুফল (‘জেন্ডার ডিভিডেন্ড’)। তখন প্রবীণদের স্বাস্থ্য ভালো রেখে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও কর্মক্ষমতাকে সমাজ ও অর্থনীতিতে কাজে লাগানো গেলে তৈরি হবে পক্বকেশ সুফল (‘গ্রে ডিভিডেন্ড’)। তাই কম জন্মহার-কে ভারতের উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে না দেখে কমতে থাকা জন্মহারের সঙ্গে দেশ কীভাবে তার মানুষকে আরও দক্ষ, সুস্থ ও স্বনির্ভর করে তুলবে সেটা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
Down to Earth; Sep; 26
