ভার্চুয়াল বেহালায় সুরধ্বনি

ভার্চুয়াল বেহালায় সুরধ্বনি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ জুন, ২০২৬

বেহালা তৈরি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রাচীন শিল্প। বলা হয় বেহালার সুর মানুষের মনের সবচেয়ে গভীরতম আবেগ প্রকাশের একটি মাধ্যম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেহালার দক্ষ কারিগররা, যাদের ‘লুথিয়ার’ বলা হয়, তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং শ্রবণশক্তির উপর নির্ভর করে বেহালার কাঠ, নকশা ও গঠন নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এখন বিজ্ঞান এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষকেরা এমন একখানা “ভার্চুয়াল বেহালা” তৈরি করেছেন, যেখানে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে বেহালার ধ্বনি কেমন হবে তা আগেভাগেই শোনা যাবে।

গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে এন পি জে অ্যাকুইস্টিক্স পত্রিকায়। গবেষকদের মতে, এটি কোনও সাধারণ ধ্বনি অনুকরণ সফটওয়্যার নয়। প্রচলিত সফটওয়্যার হাজার হাজার রেকর্ড করা স্বরধ্বনির গড় ব্যবহার করে শব্দ তৈরি করে। কিন্তু এম আই টির নতুন মডেলটি বেহালার মূল পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিতে কাজ করে। অর্থাৎ, বেহালার কাঠ, তার, গড়ন, আশপাশের বাতাস, সবকিছুর পারস্পরিক ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে ধ্বনি তৈরি করা হয়।

এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, কেন ইতালির কিংবদন্তি বেহালা নির্মাতা অ্যান্টনিও স্ট্রডিভারি -এর তৈরি স্ট্রাডিভেরিয়াস বেহালার সুর এমন অসাধারণ শোনায় তার হদিশ পাওয়া। বিজ্ঞানীরা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই এর কারণ খুঁজছেন। কেউ মনে করেন এর মূলে আল্পসের বিশেষ ধরনের স্প্রুস কাঠ, যা ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠায় বেশি ঘন হয়। অন্যরা মনে করেন কাঠের ওপর প্রলেপ হিসেবে লাগানো বিশেষ বার্নিশ বা সংরক্ষণে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থই এর আসল রহস্য। এমনকি সিটি-স্ক্যান ও ত্রিমাত্রিক লেজার স্ক্যানিং ব্যবহার করেও এই বেহালাগুলোর গঠন ও কম্পনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এম আই টির ভার্চুয়াল বেহালাটি তৈরি করা হয়েছে ১৭১৫ সালের বিখ্যাত এক স্ট্রাডিভেরিয়াস বেহালার ত্রিমাত্রিক স্ক্যানের ভিত্তিতে। গবেষকেরা সেই তথ্য ব্যবহার করে বেহালার একটি ডিজিটাল মডেল তৈরি করেন। এরপর পুরো যন্ত্রটিকে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ঘনক (কিউব)-এ ভাগ করা হয়। তারপর প্রতিটি অংশে কোন ধরনের উপাদান রয়েছে তা নির্ধারণ করা হয়। অতঃপর জটিল পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ ব্যবহার করে হিসাব করা হয় যে বেহালার বিভিন্ন অংশ কীভাবে কম্পিত হবে এবং একে অপরের সঙ্গে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করবে।

এই মডেল ব্যবহার করে গবেষকেরা একটি তার টেনে ছেড়ে দেওয়ার বিশেষ ধ্বনিটি সফলভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি এই ভার্চুয়াল বেহালা দিয়ে জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ-এর “Fugue in G Minor” এবং “Daisy Bell” সুরের কিছু অংশ বাজানোও হয়েছে। তবে এখনও বেহালার ছড়ি ব্যবহার করে বাজানোর জটিল প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে অনুকরণ করা সম্ভব হয়নি। গবেষকেরা এখন এই দিকটা নিয়েই বিশেষ করে কাজ করছেন।

গবেষকদের আশা, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে লুথিয়ারদের জন্য একটি শক্তিশালী নকশা-সহায়ক সরঞ্জাম হয়ে উঠবে। তারা কাঠের ধরন, বেহালার পুরুত্ব বা অন্যান্য নকশাগত পরিবর্তন করে সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পারবেন যে ধ্বনিতে কী পরিবর্তন এল। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচবে এবং নতুন নকশা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক সহজ হবে।

তবে গবেষকেরা এটাও স্পষ্ট করে বলেছেন যে এই প্রযুক্তি কোনও কারিগরের শিল্পীসত্তাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। বরং একে আমরা শিল্প ও বিজ্ঞানের একটা সুন্দর সমন্বয় বলতে পারি। এই সমন্বয়ই বেহালার সুরের আড়ালের বিজ্ঞানকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতের বাদ্যযন্ত্র নকশায় নতুন সম্ভাব্য দিগন্তও উন্মোচিত হবে।

 

সূত্র : npj Acoustics, 2026. DOI: 10.1038/s44384-026-00049-6 (About DOIs).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × two =