ভূকেন্দ্র উল্টোমুখে পাক খাচ্ছে

ভূকেন্দ্র উল্টোমুখে পাক খাচ্ছে

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ এপ্রিল, ২০২৫

ভূকেন্দ্রকে এতকাল স্থির ও নিরেট বলে মনে করা হত। কিন্তু নতুন গবেষণা, এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে ভাবতে প্ররোচনা যোগাচ্ছে। ভূকেন্দ্রর অবস্থান ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩,০০০ মাইলেরও গভীরে। আকারে চাঁদের চেয়ে ছোট হলেও পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। ‘নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে’ গবেষণাপত্রে ইউএসসি ডর্নসাইফ কলেজের জন ভিডেল এবং চাইনিজ একাডেমির ওয়েই ওয়াং দেখিয়েছেন, ২০১০ সাল থেকে ভূকেন্দ্রের পাক খাওয়ার গতি ধীর হচ্ছে। এটি ভূপৃষ্ঠের সাপেক্ষে উল্টো মুখে পাক খেতে শুরু করেছে। ভূপদার্থবিদরা বিভিন্ন মহাদেশ থেকে ভূমিকম্পের সংকেত ব্যবহার করে ভূকেন্দ্র সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তরল ধাতুর একটি স্তর ভূকেন্দ্রকে ঘিরে থাকে। দুই দশকের বিতর্কের পর, গবেষকরা এইসব সংকেতকে, বাস্তব ঘটনাগুলির সাথে যুক্ত করতে পেরে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন।
পৃথিবীর অভ্যন্তরকে চারটি স্তরে ভাগ করা যায়: ভূত্বক, ম্যান্টেল, তরল বাহ্যিক কেন্দ্র এবং কঠিন অভ্যন্তরীণ ভূকেন্দ্র। অনেক বিজ্ঞানী, অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের গতির তুলনা করেছেন ম্যান্টেল ও ভূত্বকের গতির সাথে। কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে যে ভূকেন্দ্র একসময় দ্রুতবেগে ঘুরত, কিন্তু এখন ধীর হয়েছে। ২০১০ সালের আশেপাশে শুরু হওয়া এই ধীরগতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। “ প্রথম সিসমোগ্রামটি দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যখন আমরা আরও দুই ডজন পর্যবেক্ষণ পেলাম, তখন ফলাফল পরিষ্কার হয়ে গেল। অন্যান্য বিজ্ঞানীরা ভিন্ন মডেলের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, কিন্তু আমাদের গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা অনস্বীকার্য,” ভিডেল বলেন। গবেষকরা ভূকম্প তরঙ্গ কাজে লাগিয়ে পৃথিবী গ্রহের দূর দূরান্ত পরীক্ষা করেছেন। কেননা এইসব তরঙ্গই ভূকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১২১টি ভূমিকম্পের রিখটার রিডিং সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিডেল জানান, অভ্যন্তরীণ ভূকেন্দ্রের কাছাকাছি কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। ভূকেন্দ্রের গতির পরিবর্তন ঘটছে তরল বাহ্যিক কেন্দ্রের ঘূর্ণনের কারণে। এই ঘূর্ণনই পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রটি উল্টে যেতে পারে। নতুন ফলাফলগুলো সেই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ভূগর্ভে এইসব স্তরের পরিবর্তন দিবসকালের দৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু সে প্রভাব এতই সামান্য যে সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে না। গবেষকদের বিশ্বাস, তরল বাহ্যিক কেন্দ্র এবং ঘন ম্যান্টেলের মধ্যে বিভিন্ন মিথস্ক্রিয়াই এইসব পরিবর্তনের জন্য দায়ী। একাধিক দশকের ভুকম্পলিপি বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন, একটি ডেটাসেট অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। আধুনিক কৌশলসমূহ এই ছবিটিকে পরিষ্কার করে দিয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে তার আকার পরিবর্তন করছে। গবেষকরা আগামী বছরগুলোতে ভূকেন্দ্রের প্যাটার্ন আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন। ভবিষ্যতের ভূমিকম্পগুলি এ সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে, আশা করা যায়। নতুন ভুকম্প তরঙ্গগুলি, পৃথিবীর বলবৈজ্ঞানিক গতিশীলতা নিয়ে কৌতূহল বাড়িয়ে, পৃথিবীর কেন্দ্রকে আরও সক্রিয় স্থান হিসেবে বিবেচনা করতে প্ররোচনা যোগাচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − eleven =