ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান সমস্যার কোয়ান্টাম সমাধান 

ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান সমস্যার কোয়ান্টাম সমাধান 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১ আগষ্ট, ২০২৬

দুটি শিশুকে সামলানো যতটা সহজ, পাঁচজনকে সামলানো ততটাই বিশৃঙ্খল। গণিতের ছবিও একই। কিছু সমস্যা আকারে যত বড় হয়, সমাধান ততই কঠিন হয়ে ওঠে। এমনই একটি বিখ্যাত সমস্যা হল ‘ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান সমস্যা’। ধরা যাক, একজন বিক্রয় প্রতিনিধি একবার করে প্রতিটি শহরে যাবেন এবং তাঁকে সবচেয়ে ছোট পথটি খুঁজে বের করতে হবে। শহর তিনটি হলে সমাধান হয়ত সহজ। কিন্তু শহরের সংখ্যা বাড়লেই সম্ভাব্য পথের সংখ্যা দ্রুত হারে বাড়তে থাকবে। এতটাই বাড়তে থাকবে যে, বর্তমানের দ্রুততম সুপারকম্পিউটারও বাস্তব ক্ষেত্রে এর সমাধান দিতে পারবে না হয়ত। কম্পিউটার বিজ্ঞানে এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় NP-hard।

লোকেশন-রাউটিং, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা, স্টোকাস্টিক যানবাহন রাউটিং, ইমেজ রিট্রিভাল ও র‍্যাঙ্কিং, ডিজিটাল গার্মেন্টস উৎপাদন, বিতরণ ব্যবস্থা এবং সময়সূচি পরিকল্পনাসহ নানা ক্ষেত্রে ‘ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান সমস্যা’ সফলভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। আগে এই সমস্যার সমাধানকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেত। এক্স্যাক্ট অ্যালগরিদম, ট্রান্সফরমেশন পদ্ধতি, রিডাকশন পদ্ধতি, অ্যাপ্রক্সিমেশন অ্যালগরিদম এবং হিউরিস্টিক ও মেটাহিউরিস্টিক পদ্ধতি।

এক্স্যাক্ট অ্যালগরিদম: সর্বোত্তম বা শতভাগ সঠিক সমাধান খুঁজে বের করা। তবে বড় সমস্যায় সময় লাগে বেশি।

ট্রান্সফরমেশন পদ্ধতি: ‘জেনারালাইজড ট্রাভেলিং সেলসম্যান প্রবলেম’ কে অন্য পরিচিত সমস্যায় রূপান্তর করে, যাতে বিদ্যমান অ্যালগরিদম ব্যবহার করা যায়।

রিডাকশন পদ্ধতি: অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে সমস্যাকে ছোট ও সহজ করে নেওয়া।

অ্যাপ্রক্সিমেশন অ্যালগরিদম: অল্প সময়ে সর্বোত্তমের খুব কাছাকাছি কোন একটি সমাধান বার করা।

হিউরিস্টিক ও মেটাহিউরিস্টিক পদ্ধতি: বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ব্যবহার করে দ্রুত ভালো সমাধান খুঁজে বের করা, যদিও তা সব সময় সর্বোত্তম নাও হতে পারে।

তবে এবার ‘ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান সমস্যা’ বা NP Hard নিয়ে অন্যরকম দিশা দেখাচ্ছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োগিক গণিতবিদ নাতালিয়া বেরলফ এবং তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষক দল। তাঁরা এমন একটি বিশেষ কোয়ান্টাম ডিভাইস তৈরি করেছেন, যা সরাসরি সব ধরনের সমস্যা সমাধান করতে না পারলেও NP-hard শ্রেণির একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক সমস্যার সমাধানে বেশ আশাজনক ফল দেখিয়েছে।

 

গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে XY মডেল। চৌম্বক পদার্থে পরমাণুগুলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চৌম্বক ক্ষেত্র কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করে, এই মডেল তারই ব্যাখ্যা করে। সবচেয়ে কম শক্তির বা গ্লোবাল মিনিমাম অবস্থান খুঁজে বের করাই এর মূল চ্যালেঞ্জ। প্রচলিত অ্যালগরিদম প্রায়ই স্থানীয় সর্বনিম্ন অবস্থায় আটকে যায়, ফলে প্রকৃত সর্বোত্তম সমাধান অধরাই থেকে যায়। এহেন বাধা কাটাতে গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন ‘পোলারিটন’ নামের এক বিশেষ কোয়ান্টাম কণা। যা আলো ও পদার্থের মিশ্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। নির্দিষ্ট ঘনত্বে পৌঁছালে কণাগুলি সমন্বিত হয়ে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট তৈরি করে। এবার বুঝে নেওয়া যাক এই বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট কি? স্বাভাবিক অবস্থায় পরমাণুগুলো আলাদা আলাদা কণার মতো আচরণ করে। কিন্তু তাপমাত্রা অত্যন্ত কমিয়ে দিলে কিছু বিশেষ ধরনের পরমাণু এত ধীর হয়ে যায় যে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে একটি একক কোয়ান্টাম তরঙ্গের মতো আচরণ করতে শুরু করে। অর্থাৎ, হাজার বা লাখো পরমাণু যেন একটি ‘অতি-পরমাণু’ হিসেবে কাজ করতে থাকে। এই অবস্থাকেই বলা হয় বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট। গবেষকেরা কণাগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে সেগুলি XY মডেলের আচরণ অনুকরণ করে। ফলে সিস্টেমটি স্বাভাবিকভাবেই সর্বনিম্ন শক্তির অবস্থানে পৌঁছে যায় এবং সেই অবস্থান থেকেই সমস্যার সমাধান পড়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

এখনও অবধি গবেষণা দলে ১০০টি সাইটবিশিষ্ট ডিভাইস তৈরি হয়েছে। তবে তাঁদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে এটিকে কয়েক হাজার সাইটে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। তখন এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত ফল দিতে পারবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে NP-hard সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া গেছে। সমস্যাগুলোর সমাধান এখনও আকারের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কঠিন হয়ে উঠবে। তবে লক্ষ্য থাকবে অসম্ভবকে সহজ করে ফেলা নয়, বরং বর্তমান কম্পিউটিং প্রযুক্তির সীমা আরও কিছুটা এগিয়ে নেওয়া।

তবে গবেষণার পেছনের গল্পটিও কম নাটকীয় নয়। কয়েক বছর আগে নাতালিয়া বেরলফ এবং তাঁর গবেষক দলের একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাব তিনটি বিজ্ঞান পত্রিকা প্রত্যাখ্যান করেছিল। একজন রিভিউয়ার-এর মন্তব্য ছিল, “এটা বাস্তবে তৈরি করার মতো পাগল কে আছে?” সেই চ্যালেঞ্জই গ্রহণ করেছিলেন গবেষকেরা। আজ পরীক্ষামূলক তথ্য দিয়ে তাঁরা দেখালেন, অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া ধারণাও একদিন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

 

সূত্র: University of Cambridge ; July ; 202

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 5 =