মঙ্গলে নদী-বদ্বীপ ! 

মঙ্গলে নদী-বদ্বীপ ! 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ এপ্রিল, ২০২৬

আজকের শুষ্ক, লাল ধূলিময় মঙ্গলের বুকে একসময় বইত নদী, গড়ে উঠত বদ্বীপ, আর বিস্তৃত হ্রদের জলে জমা হতো পলি স্তর। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সেই হারিয়ে যাওয়া জগতেরই পাকাপোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করলো। নাসার মার্স 2020 পারসিভিয়ারেন্স রোভারের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, প্রায় ৪.২ বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলে একটি সুগঠিত নদী-বদ্বীপ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। এই গবেষণায় মিশন শুরু হওয়ার পর থেকে পাওয়া কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন লস এঞ্জেলসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতিঃ-জীববিজ্ঞানী এমিলি কার্ডারেলি এবং তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে ছিল মঙ্গলের জেজিরো গহ্বর। এই অঞ্চলে আগেই প্রাচীন হ্রদ, নদী ও জলপ্রবাহের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। তবে নতুন তথ্য বলছে, এই জলীয় পরিবেশের ইতিহাস আরও প্রাচীন এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

পারসিভিয়ারেন্স রোভারের অত্যাধুনিক RIMFAX যন্ত্র মঙ্গলগর্ভের ৩৫ মিটার গভীর পর্যন্ত স্তর বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন গঠন শনাক্ত করেছে। এই গঠনগুলো স্পষ্টভাবে নদী ও বদ্বীপের উপস্থিতি নির্দেশ করে। বদ্বীপের প্রান্তীয় স্তরের এলাকায় পাওয়া স্তরগুলো থেকে বোঝা যায় একসময় সেখানে সক্রিয় নদী প্রবাহিত হতো, পলি জমা হতো, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতো জটিল ভূ-প্রকৃতি, অনেকটা পৃথিবীর নদীব্যবস্থার মতো। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্ভবত একসময়কার আঁকাবাঁকা নদী, পলল পাখা (পলি জমা হয়ে গঠিত পাখা বা ত্রিকোণ ভূমিরূপ) অথবা বহু শাখাবিশিষ্ট নদীর অবশেষ। গবেষকদের মতে, এই গঠনগুলো তৈরি হয়েছিল মঙ্গলের প্রাচীন নোয়াকিয়ান যুগে (প্রায় ৪.২–৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে)।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কার্বনেট খনিজের উপস্থিতি, বিশেষ করে ম্যাগনেশিয়াম কার্বনেট। এই খনিজগুলো তৈরি হয় জল ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের পারস্পরিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। এগুলো মঙ্গলের অতীত জলবায়ু ও পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করে। তবে এত বৃহৎ পরিসরে এই খনিজ কীভাবে গঠিত হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

এই আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, জেজিরো গহ্বরে একসময় একটি জলসমৃদ্ধ এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্য পরিবেশ ছিল, যেখানে জীবনের উপযোগী পরিস্থিতি থাকতে পারত। এমনকি সেখানে প্রাচীন জীবনের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমানে পারসিভিয়ারেন্স রোভারটি প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে এবং গহ্বরের প্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে গবেষকরা আরও বিশ্লেষণ চালিয়ে যাবেন, বিশেষ করে নেরেতভা ভ্যালিস অঞ্চলে, যেখানে সম্ভাব্য জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এই চিহ্নগুলো সত্যিই জীবনের প্রমাণ কিনা, তা নিশ্চিত করতে আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন।

 

সুত্র: Ground penetrating radar observations of ancient large-scale deltaic structures in Jezero crater, Mars,by Emily L. Cardarelli published in Science Advances, 18th March 2026, Vol 12, Issue 12.

DOI: 10.1126/sciadv.adz6095

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − 8 =