মনের চিকিৎসায় সাইলোসাইবিন   

মনের চিকিৎসায় সাইলোসাইবিন   

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ মার্চ, ২০২৬

২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়া একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চিকিৎসাবিদ্যায় সাইলোসাইবিনভিত্তিক থেরাপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয় তারা। সাইলোসাইবিন হলো কিছু বিশেষ ধরনের ছত্রাক থেকে পাওয়া একটি মনঃপ্রভাবক যৌগ/সাইকেডেলিক যৌগ। খুব সম্ভব এই যৌগের উৎস হল “ম্যাজিক মাশরুম’’ নামক বিশেষ এক প্রকৃতির ছত্রাক। বহু দশক ধরে এই যৌগটি বিকল্প চিকিৎসা ও গবেষণার আলোচনায় থাকলেও, অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত প্রথমবারের মতো এটিকে নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশে পরিণত করে।

ওই সিদ্ধান্তের বছর দুয়েক পর, ২০২৫ সালে প্রকাশিত নতুন গবেষণার ফলাফল সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্ন সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ–এর গবেষকেরা বাস্তব চিকিৎসাধীন পরিবেশে প্রথম দুই বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে সাইলোসাইবিন থেরাপি গুরুতর মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় বেশ আশানুরূপ সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধি (PTSD) এবং চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতার ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল দ্য ল্যানসেট সাইকিয়াট্রিতে।

এ গবেষণায় প্রধানত দুটি জটিল মানসিক অবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়— ১) PTSD বা আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধি এবং ২) চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতার উপর। এইসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই প্রচলিত ওষুধ বা থেরাপি থেকে পর্যাপ্ত উপকার পান না। সাইলোসাইবিনের কাজ করার পদ্ধতিটি মূলত মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্কিত, যাকে বলা হয় ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক আমাদের আত্মপরিচয়, স্মৃতি, চিন্তার পুনরাবৃত্তি এবং নেতিবাচক আত্ম-ধারণার সঙ্গে যুক্ত। পি টি এস ডি বা দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্ক প্রায়ই কঠোর ও স্থবির চিন্তার চক্র তৈরি করে। যার ফলে মানুষ একই নেতিবাচক স্মৃতি ও অনুভূতির মধ্যে আটকে পড়ে। মস্তিষ্কের এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রমই সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে সাইলোসাইবিন।

এবার সাইলোসাইবিন গ্রহণের ফলে প্রায় ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে মানুষের কঠোর আত্ম-ধারণা ও মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে এই সময়ে রোগীরা গভীর আবেগ, দমিয়ে রাখা স্মৃতি বা ট্রমার মুখোমুখি হতে পারেন। এর ফলে এমন অনেক মানসিক সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়, যা বহু বছর ধরে প্রচলিত মনোচিকিৎসায় অমীমাংসিত থেকে যায়।

মেলবোর্নে পরিচালিত ৪০০ জন রোগীর উপর বাস্তব চিকিৎসা ফলাফলের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে পিটিএসডি রোগীদের মধ্যে ৭২ শতাংশ এবং চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৬৮ শতাংশের উন্নতি হয়েছে। আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, চিকিৎসার ১২ মাস পরেও ৫৮ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ উপসর্গমুক্ত ছিলেন এবং তাদের বাড়তি চিকিৎসার প্রয়োজন পড়েনি।

গবেষণায় এও দেখা গেছে যে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাইলোসাইবিন ব্যবহারে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম। ফলে এই পদ্ধতিকে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার একটি সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগ মূলত এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতিকে বৈধতা দিয়েছে, যা বহু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আড়ালে আবডালে ব্যবহার হয়ে আসছিল। এখন এহেন ইতিবাচক ফলাফল দেখে যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশও সাইলোসাইবিন থেরাপির নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে। গবেষকেরা মনে করছেন, মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় এটি ভবিষ্যতের এক বড় বিপ্লবের সূচনা হতে পারে।

 

সূত্র: University of Melbourne Centre for Mental Health, The Lancet Psychiatry, 2025 .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − 6 =