মলিকিউলার বিম এপিট্যাক্সি প্রযুক্তিতে বন্দি আলো 

মলিকিউলার বিম এপিট্যাক্সি প্রযুক্তিতে বন্দি আলো 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা মানুষের চুলের চেয়েও প্রায় ২,০০০ গুণ পাতলা এক পদার্থের ভেতরে আলোকে বন্দি করতে সক্ষম হয়েছেন । শুনে কল্পকাহিনি মনে হলেও, এটাই এখন বাস্তব, এটাই বিজ্ঞান। ন্যানোটেকনোলজি ও ফোটোনিক্সের জগতে এই একরকম নতুন দিক খুলে দেওয়া সাফল্য ভবিষ্যতের কম্পিউটার, লেজার এবং অতিদ্রুত যোগাযোগ প্রযুক্তিকে আমূল বদলে দিতে পারে। পোল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারশ-এর গবেষকদের এই সাফল্যের বিস্তারিত কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে এ সি এস ন্যানো জার্নালে।

এই গবেষণায় ব্যবহৃত উপাদানটির নাম মলিবডেনাম ডাইসেলেনাইড (MoSe₂)। এটি ট্রানজিশন মেটাল /সন্ধিগত মৌল ডাইক্যালকোজেনাইডস (TMDs) পরিবারের সদস্য। এ এক শ্রেণির অতিপাতলা উন্নত পদার্থ, যেগুলো সম্ভবত আগামী দিনের ইলেকট্রনিক্সের মুখ্য চরিত্র। গবেষকেরা মাত্র ৪২ ন্যানোমিটার পুরু একটি স্তর তৈরি করেছেন, যা মানুষের চুলের গড় পুরুত্বের তুলনায় প্রায় ২,০০০ গুণ পাতলা। এত ক্ষুদ্র স্তরে আলোকে ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এত সূক্ষ্ম স্তরে আলোকে নিয়ন্ত্রণ করার এই অসম্ভবই এবার সম্ভব হল।

এই সাফল্যের পেছনে ছিল অত্যন্ত নিখুঁত নির্মাণ প্রযুক্তি মলিকিউলার বিম এপিট্যাক্সি। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক স্তরে উপাদান সাজিয়ে কাঙ্ক্ষিত গঠন তৈরি করেন। এরপর সেই স্তরে বিশেষ ধরনের জালিকা বা lattice pattern তৈরি করা হয়, যা আলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষকরা ব্যবহার করেছেন Bound State in the Continuum (BIC)/ ধারাবাহিকতায় বদ্ধ অবস্থা নামক এক বিরল ভৌত ঘটনা। সাধারণত আলো যখন কোনো পদার্থে প্রবেশ করে, তখন তা ছড়িয়ে পড়ে কিংবা বেরিয়ে যায়। কিন্তু BIC দশায় আলো চারপাশে বিকিরিত হওয়ার সুযোগ পেয়েও কাঠামোর ভেতর আটকে থাকে। এই অদ্ভুত ভৌত প্রভাবেই আলোর ওপর এমন নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।

এর সম্ভাব্য ব্যবহারের ক্ষেত্র বেশ সুদূরপ্রসারী। ভবিষ্যতের অপটিক্যাল কম্পিউটিং-এ বিদ্যুতের বদলে আলো ব্যবহার করা হতে পারে। এতে প্রসেসরের গতি বহুগুণ বাড়বে, শক্তি খরচ কমবে এবং যন্ত্রের আকার হবে অনেক ছোট। বর্তমান সিলিকন-ভিত্তিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এমন আবিষ্কারের তাৎপর্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হতে পারে অতি-ক্ষুদ্র লেজার, দ্রুতগতির ফোটোনিক সার্কিট, উন্নত সেন্সর এবং নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ ব্যবস্থা। চিকিৎসা প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বৃহৎ পরিসরে একই মান বজায় রেখে এই উপাদান তৈরি করা সহজ নয়। তবু বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, কারণ একই কৌশল অন্য অতিপাতলা পদার্থেও প্রয়োগ করা সম্ভব।

সূত্র: ACS Nano journal (April 2026)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 15 =