অণুজীবরা আর উপেক্ষিত থাকবে না  

অণুজীবরা আর উপেক্ষিত থাকবে না  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো একটি বিস্তৃত কর্ম পরিকল্পনার পথচিত্র তৈরি করেছেন। লক্ষ্য হল, পৃথিবীর অদৃশ্য অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অণুজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আই ইউ সি এন) অধীনে গঠিত মাইক্রোবিয়াল কনজারভেশন স্পেশালিস্ট গ্রুপ (এমসিএসজি) এই উদ্যোগের নেতা। অ্যাপ্লায়েড মাইক্রোবায়োলজি ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর জ্যাক গিলবার্টের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই রোডম্যাপ বৈশ্বিক সংরক্ষণ নীতিতে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে।

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ অণুজীব, অথচ এ পর্যন্ত গাছপালা ও প্রাণীর তুলনায় তারা একপ্রকার উপেক্ষিতই ছিল। মাটির উর্বরতা, কার্বন চক্র নিয়ন্ত্রণ, সমুদ্রের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা, এমনকি মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মৌলিক স্বাস্থ্য রক্ষা—সব ক্ষেত্রেই অণুজীব অপরিহার্য। এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এরা কিন্তু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ পরিকল্পনার বাইরে ছিল। এই নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগটি অণুজীবকে মূলধারার সংরক্ষণ কাঠামোর আওতায় এনে সেই ঘাটতিই পূরণ করতে চায়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে আই ইউ সি এন আনুষ্ঠানিকভাবে এম সি এস জি প্রতিষ্ঠা করে। এর আগে মে মাসে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় বিশ্বজুড়ে অণুজীববিদ, পরিবেশবিদ, সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ এবং আদিবাসী জ্ঞানধারীরা একত্রিত হয়ে আলোচনা করেন—অণুজীবের সংরক্ষণনীতিতে কী ধরনের কাঠামো প্রয়োজন। এই প্রচেষ্টা কেবল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গিকেই যে বদলায় তা নয়, পৃথিবীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষার নতুন ধারনাও তুলে ধরে।

গবেষকদের মতে অণুজীব গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, খাদ্য নিরাপত্তা, মাটি ও সমুদ্রের পুনরুদ্ধার সবই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই পথচিত্রটির পাঁচটি মূল ভিত্তি হল:

1. মূল্যায়ন: অণুজীবের জন্য লাল তালিকা-সমন্বিত সূচক তৈরি ও জিনব্যাংক উন্নয়ন।

2. পরিকল্পনা: অণুজীব-জগতে হস্তক্ষেপের নৈতিক, অর্থনৈতিক ও নীতিগত কাঠামো নির্মাণ।

3. কার্যকর উদ্যোগ: কোরাল প্রোবায়োটিক, মাটির কার্বন পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণীর রোগ প্রতিরোধ—এসব ক্ষেত্রে অণুজীব ব্যবহারের পরীক্ষামূলক প্রকল্প।

4. আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক: ৩০টিরও বেশি দেশের বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা।

5. যোগাযোগ ও নীতি: “অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য” প্রচারের মাধ্যমে জনসাধারণ ও নীতিনির্ধারকদের সচেতন করা।

অণুজীব সংরক্ষণে নানা জটিলতা রয়েছে। প্রজাতি নির্ধারণ, জিনগত বৈচিত্র্য, দ্রুত পরিবর্তনশীল মাইক্রোবায়োম, মানব-সম্পর্কিত নমুনা ব্যবহারের নৈতিকতা —এই সবই বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও আই ইউ সি এন-এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এই ক্ষেত্রকে বৈশ্বিক নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

আগামী কয়েক বছরে এম সি এস জি অনুজীবদের প্রথম লাল তালিকা প্রকাশ, বিশ্ব জুড়ে অনুজীবদের প্রধান প্রধান ঘাঁটির মানচিত্র প্রণয়ন, এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে অণুজীবভিত্তিক প্রযুক্তি পরীক্ষার পরিকল্পনা করছে। তাঁদের আশা, ২০৩০ সালের মধ্যেই গাছপালা ও প্রাণীর পাশাপাশি অণুজীবও আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে।

 

সূত্র: “Safeguarding microbial biodiversity: microbial conservation specialist group within the species survival commission of the International Union for Conservation of Nature” by Jack A Gilbert, Amber Hartman Scholz, et.al; (20th November 2025), Sustainable Microbiology.

DOI: 10.1093/sumbio/qvaf024

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + 7 =