‘মহা আকর্ষক’ অভিমুখে ছুটন্ত আকাশগঙ্গা

‘মহা আকর্ষক’ অভিমুখে ছুটন্ত আকাশগঙ্গা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ জুন, ২০২৬

আমরা সাধারণত ভাবি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, আর সূর্য মিল্কি ওয়ে বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের এই আস্ত ছায়াপথটি নিজেই স্থির নয়। বর্তমানে আকাশগঙ্গা, মহাকাশে সেকেন্ডে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। এই গতির মধ্যে রয়েছে আমাদের সৌরজগত, পৃথিবী এবং পৃথিবীর সব জীবও। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, আকাশগঙ্গা একটি বিশাল মহাকর্ষীয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার নাম ‘গ্রেট অ্যাট্রাক্টর’ বা ‘মহা-আকর্ষক’। গ্রেট অ্যাট্রাক্টর কোনও একক নক্ষত্র, গ্রহ বা গ্যালাক্সি নয়। এটি মহাবিশ্বের এমন অঞ্চল, যেখানে বিপুল পরিমাণ পদার্থ ও গ্যালাক্সি একত্রিত হয়েছে। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। এত বিশাল ভরের কারণে এই অঞ্চলের মহাকর্ষীয় টান অসংখ্য গ্যালাক্সির গতিপথকে প্রভাবিত করছে। শুধু আকাশগঙ্গাই নয়, আমাদের নিকটতম বৃহৎ প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিসহ আশপাশের হাজার হাজার গ্যালাক্সিও ওই একই দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের শক্তিশালী মহাকর্ষই এর অন্যতম কারণ। তবে এই রহস্যময় অঞ্চলকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সহজ নয়। কারণ এটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘন কেন্দ্রীয় চাকতির আড়ালে অবস্থিত। আমাদের ছায়াপথের অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলিকণা দূরের মহাজাগতিক বস্তুকে আড়াল করে রাখে। ফলে মহাকাশের একটি বড় অংশ কার্যত চোখের আড়ালে থেকে যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলকে ‘জোন অব অ্যাভয়ডেন্স’ বা ‘পর্যবেক্ষণ-এড়ানো অঞ্চল’ বলে চিহ্নিত করেছেন। এখানে দৃশ্যমান আলোর সাহায্যে দূরের গ্যালাক্সি শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। তাহলে গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের অস্তিত্ব জানা গেল কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে গ্যালাক্সিগুলির গতিবিধিতে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গ্যালাক্সির গতি ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখেন, অনেক গ্যালাক্সিই মহাকাশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। এই অস্বাভাবিক গতিপ্রবাহই ইঙ্গিত দেয় যে সেখানে কোনও বিশাল মহাকর্ষীয় উৎস রয়েছে। যদিও সেটিকে সরাসরি দেখা যায়নি, তবু তার মহাকর্ষের প্রভাব থেকেই গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা অবশ্য আরও বড় একটি চিত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আকাশগঙ্গার গতিবিধি শুধু গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের প্রভাবে নির্ধারিত হচ্ছে না। এর বাইরে আরও বৃহৎ মহাজাগতিক কাঠামোরও ভূমিকা আছে। তার মধ্যে অন্যতম হল শ্যাপলি সুপারক্লাস্টার। এটি নিকটবর্তী মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিশাল গ্যালাক্সি-সমাবেশগুলির একটি। এই সুপারক্লাস্টারের মহাকর্ষীয় প্রভাবও আমাদের ছায়াপথের গতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব আবিষ্কার মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। একসময় মনে করা হতো, গ্যালাক্সিগুলি মহাকাশে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, তারা একটি বিশাল ‘কসমিক ওয়েব’ বা মহাজাগতিক জালের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই জাল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পদার্থ ও অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় প্রভাব কোটি কোটি বছর ধরে গ্যালাক্সিগুলির গতিপথ নির্ধারণ করে চলেছে। অর্থাৎ, আমরা যে আকাশগঙ্গায় বাস করি, সেটিও মহাবিশ্বের এই বিশাল মহাকর্ষীয় নৃত্যের একটি অংশ— এমন এক যাত্রা, যার শেষ গন্তব্য এখনও রহস্যে ঢাকা, অজানা।

সূত্র: Space Science ; June ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + 12 =