মহাকাশে বৃহস্পতি-সম বিশাল উপগ্রহ 

মহাকাশে বৃহস্পতি-সম বিশাল উপগ্রহ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মহাবিশ্বের অদ্ভুতুড়ে জগৎ আবারও বিজ্ঞানীদের চমকে দিল। পৃথিবী থেকে ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে আবিষ্কৃত হয়েছে এমন এক মহাজাগতিক বস্তু, যার পরিচয় প্রচলিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রহ-উপগ্রহের সংজ্ঞার বিপ্রতীপ। কি আশ্চর্যের বিষয়! এই মহাজাগতিক বস্তুটি আকারে প্রায় বৃহস্পতির সমান, অথচ সেটি নিজে কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে না। ঘুরছে একটি বাদামি বামনগ্রহকে কেন্দ্র করে। গবেষকেরা সে কারণেই এই বস্তুটিকে সম্ভাব্য এক্সোস্যাটেলাইট/সৌরজগৎ বহির্ভূত উপগ্রহ নামে অভিহিত করেছেন।

এটি মূলত CD-35 2722 নামক একটি লাল বামন নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা এক ত্রি-স্তরীয় মহাজাগতিক ব্যবস্থা। সেখানে নক্ষত্রটির চারপাশে ঘুরছে একটি বাদামি বামন গ্রহ, যার ভর বৃহস্পতির প্রায় ৩৭ গুণ। আর সেই বাদামি বামনের চারদিকে ঘুরছে নতুন আবিষ্কৃত বস্তুটি। এর ন্যূনতম ভর বৃহস্পতির প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ এটি আকার ও ভরের দিক থেকে সৌরজগতে আমাদের পরিচিত উপগ্রহগুলোর তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রমী।

কিন্তু কথা হচ্ছে, এত বড় বস্তুটিকে কীভাবে খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা? চিলিতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান সাদার্ন অবজারভেটরির অতি বৃহৎ টেলিস্কোপ (VLT)-এর CRIRES+ যন্ত্রের সাহায্যে বস্তুটির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। CRIRES+ স্পেকট্রোগ্রাফ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা বাদামি বামন নক্ষত্রের আলোর ডপলার শিফট পর্যবেক্ষণ করেন। সম্ভাব্য উপগ্রহটির মহাকর্ষীয় টানে বাদামি বামনের যে সূক্ষ্ম দোলন তৈরি হয়, তারই চিহ্ন ধরা পড়ে আলোয়। এই পদ্ধতিটি আগে বহির্জাগতিক গ্রহ শনাক্ত করতেও সফল হয়েছিল।

কিন্তু এই আবিষ্কারের বিশেষত্ব শুধু এর আকারে নয়, এর কক্ষপথও অস্বাভাবিক। বস্তুটি মাত্র ১৭০ দিনে বাদামি বামনগ্রহকে একবার প্রদক্ষিণ করে। অন্যদিকে সেই বাদামি বামন গ্রহটি তার নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ৫০০০ বছর। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি অনেকটা মহাজাগতিক ত্রি-স্তরীয় কাঠামোর মতো: উপগ্রহ → বাদামি বামন গ্রহ → নক্ষত্র।

এর আগে 2M1207b-এর মতো বিশাল বস্তু বাদামি বামনগ্রহকে প্রদক্ষিণ করতে দেখা গেলেও সেগুলোকে সাধারণত উপগ্রহ বলা হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় ভর ও কক্ষপথের অনুপাত এতটাই আলাদা যে গ্রহ বা উপগ্রহ—কোনো প্রচলিত পরিচয়ই পুরোপুরি যথাযথ নয়। তাই গবেষকেরা ‘এক্সোস্যাটেলাইট’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। বাংলায় কি আমরা ‘ বহিরুপগ্রহ’ নাম দিতে পারি?

তবে আরও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, এত বিশাল উপগ্রহ তৈরিটা হলো কীভাবে? আমাদের সৌরজগতের উপগ্রহগুলো সাধারণত গ্রহকে ঘিরে থাকা ধূলি ও গ্যাসের চাকতি থেকে তৈরি হয়। কিন্তু বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের এই অদ্ভুত বস্তুটির জন্ম সেই একই প্রক্রিয়ায় হয়েছে কি না, সেটা এখনও নিশ্চিতরূপে জানা যায়নি। এই বস্তুটির গঠন ও উৎপত্তি বুঝতে ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণ আবশ্যিক।

সূত্র: https://physicsworld.com/a/discovery-of-giant-exosatellite-challenges-our-notion-of-what-makes-a-moon/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + fourteen =