চাঁদে যাওয়ার আর্টেমিস-২ অভিযানের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে মহাকাশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একটি বড় প্রশ্নর উত্তর এখনও মেলেনি – মহাকাশে কি নিরাপদে গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসব সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ড. বর্ষা জৈন। তাঁর মতে, তত্ত্বগতভাবে এটি সম্ভব হলেও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য অত্যন্ত সীমিত। এখনও পর্যন্ত কোনো নারী মহাকাশে গর্ভবতী হননি। ফলে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরসহ অন্যান্য প্রাণীর উপর পরিচালিত মহাকাশ গবেষণা এবং প্যারাবলিক ফ্লাইটের তথ্য থেকেই ধারণা গঠন করছেন। ড. জৈন জানান, মহাকাশে মানবদেহের উপর অধিকাংশ গবেষণাই পুরুষ নভোচরদের ভিত্তিতে হয়েছে। নারীদের শরীর, বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মহাকাশের প্রভাব নিয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। ১৯৬৩ সালে ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে গেলেও, দীর্ঘদিনই নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। আজও প্রতি একজন নারী নভোচারীর বিপরীতে প্রায় ছ’জন পুরুষ মহাকাশে গেছেন। গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মহাজাগতিক বিকিরণ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বক ক্ষেত্র মানুষকে এই বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দিলেও মহাকাশে তা অনুপস্থিত। উচ্চশক্তির কণার আঘাতে কোষের ক্ষতি, ক্যানসার, জিনগত ত্রুটি এবং ভ্রূণের বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেখানে একটি বুকের এক্স-রেতে বিকিরণ মাত্রা ০.১ মিলিসিভার্ট, সেখানে নভোচররা ৫০ থেকে ২,০০০ মিলিসিভার্ট পর্যন্ত বিকিরণের মুখোমুখি হতে পারেন। অন্য বড় উদ্বেগ হল মাইক্রোগ্রাভিটি। এতে হাড় ও পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা গর্ভাবস্থার বাড়তি শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রাণীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, ভারশূন্য পরিবেশে গর্ভবতী ইঁদুরের প্রসববেদনা স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ ছিল। প্রসবও মহাকাশে অত্যন্ত সমস্যা জনক। ভারশূন্য পরিবেশে সিজারিয়ানের মতো জরুরি অস্ত্রোপচার, রক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। এছাড়া দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় যে স্পেসফ্লাইট অ্যানিমিয়া দেখা দেয় তাই প্রসবকালীন রক্তক্ষরণের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যদি ভবিষ্যতে চাঁদ বা মঙ্গলে স্থায়ী বসতি গড়তে চায়, তবে মহাকাশে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা অপরিহার্য। ড. জৈনের মতে, মহাকাশে সন্তান জন্মের প্রশ্নটি শুধু ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য নয়, পৃথিবীতেও নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। তাঁর কথায়, নারীর স্বাস্থ্য, প্রজনন ও গর্ভাবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণা ছাড়া মহাকাশে মানব বসতি গড়ার স্বপ্ন পূরণ কঠিন হবে।
সূত্র: Popular Science ; August 2026
