মহান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া এঙ্গলেয়ার-এর প্রয়াণ  

মহান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া এঙ্গলেয়ার-এর প্রয়াণ  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ জুলাই, ২০২৬

২০২৬ সালের ১৮ জুন ৯৩ বছর বয়সে বেলজিয়ামের নোবেলজয়ী তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ফ্রাঁসোয়া এঙ্গলেয়ার মৃত্যুবরণ করেছেন। আধুনিক কণা-পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি এক পুরোধা ছিলেন। তাঁর গবেষণা আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলি কীভাবে ভর লাভ করে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পথ দেখিয়েছিল। তাঁর অবদানের কারণেই শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে হিগস বোসন কণার আবিষ্কার সম্ভব হয়। এটি বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাফল্যগুলির একটি হিসেবে বিবেচিত। তাঁর প্রয়াণে শুধু একজন নোবেলজয়ী পদার্থবিদকেই নয়, আধুনিক কণা-পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম স্থপতিকেও হারাল বিশ্ব।

১৯৩২ সালের ৬ নভেম্বর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে শহরে জন্মগ্রহণ করেন এঙ্গলেয়ার। তিনি প্রথমে ব্রাসেলসের ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদ্যুতিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহের কারণে বিষয় পরিবর্তন করেন এবং ১৯৫৯ সালে তিনি পিএইচ ডি সম্পন্ন করেন। কিছু সময় যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পর তিনি আবার ব্রাসেলসে ফিরে আসেন এবং প্রায় পুরো কর্মজীবন সেখানেই কাটান।

এঙ্গলেয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পর্ব শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকের শুরুতেই। তিনি তাঁর সহকর্মী রবার্ট ব্রাউটের সঙ্গে কাজ করে দেখান যে মহাবিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত একটি অদৃশ্য ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে মৌলিক কণাগুলি হয়তো ভর অর্জন করতে পারে। এই ধারণার ভিত্তি ছিল “স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গ” নামের একটি তত্ত্ব। এর কিছুদিন আগে ইয়োচিরো নাম্বু এই ধারণাকে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বে প্রয়োগ করেছিলেন। সেই কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এঙ্গলেয়ার ও ব্রাউট ১৯৬৪ সালে দেখান যে দুর্বল ও তড়িৎচুম্বকীয় বলকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

একই সময়ে ব্রিটিশ তত্ত্বীয় পদার্থবিদ পিটার হিগস স্বাধীনভাবে একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছান এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন একটি নতুন মৌলিক কণার অস্তিত্বের। সেটাই পরে “হিগস বোসন” নামে পরিচিত হয়। কিন্তু তত্ত্বকে বাস্তব প্রমাণে রূপ দিতে বিজ্ঞানীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় অর্ধশতাব্দী।

প্রায় পাঁচ দশকের অনুসন্ধানের পর ২০১২ সালে সার্ন-এর Large Hadron Collider-এ পরিচালিত ATLAS ও CMS পরীক্ষায় প্রায় ১২৫ গিগা-ইলেকট্রনভোল্ট ভরের হিগস বোসনের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়। এই আবিষ্কারকে অনেকেই “একবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক বিজয়” বলে অভিহিত করেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে এঙ্গলেয়ার ও হিগস যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁদের সহযোদ্ধা রবার্ট ব্রাউট ২০১১ সালেই মৃত্যু বরণ করেছিলেন। নোবেল পুরস্কার মরণোত্তর প্রদান করা হয় না বলে তাঁর নাম সেই তালিকায় যুক্ত হয়নি। তবুও বৈজ্ঞানিক সমাজে ব্রাউট–এঙ্গলেয়ার–হিগস ত্রয়ীর অবদান অবিচ্ছেদ্য।

 

নোবেল পুরস্কারের পাশাপাশি এঙ্গলেয়ার ফ্রাঙ্কুই প্রাইজ, পদার্থ বিদ্যায় উল্ফ প্রাইজ এবং জে.জে. সাকুরাই প্রাইজ-সহ বহু মর্যাদাপূর্ণ সম্মান অর্জন করেছিলেন। ২০১৩ সালে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় অ্যালবার্ট তাঁকে ‘ব্যারন’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সহকর্মীদের কাছে এঙ্গলেয়ার শুধু একজন অসাধারণ বিজ্ঞানীই ছিলেন না, ছিলেন বিনয়ী ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর সহকর্মী পদার্থবিদরা প্রায়ই উল্লেখ করেছেন,একপ্রকার যুগান্তকারী আবিষ্কারের নায়ক হয়েও তিনি কখনও অহংকারকে প্রশ্রয় দেননি। তাঁর গবেষণা আজকের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

মহাবিশ্বে ভরের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে আমূল বদলে দেওয়া এই বিজ্ঞানীর মৃত্যু পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক যুগের অবসান ঘটালেও, তাঁর বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার আগামী বহু প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেই চলবে।

 

সূত্র: Belgian Nobel-prize-winning theoretical physicist François Englert dies aged 93, Published on 22nd June 2026, Michael Banks,physicsworld.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − 10 =