মা-অক্টোপাসের আত্মত্যাগ

মা-অক্টোপাসের আত্মত্যাগ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

সমুদ্রের অতল অন্ধকারে, সূর্যের আলো যেখানে কখনই পৌঁছায় না, সেখানে এক মা অক্টোপাস তার অনাগত সন্তানদের আগলে বসেছিল। চার বছর পাঁচ মাস ধরে চলেছিল তার এই অপেক্ষা। না ছিল খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার অবকাশ, না ছিল বিশ্রামের জন্য সন্তানদের ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ। নিজের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়লেও সে কিন্তু ডিমগুলিকে ছেড়ে যায়নি। অবশেষে একদিন ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। কিন্তু তত দিনে তাদের মা চিরতরে হারিয়ে গেছে। প্রকৃতির বুকে মাতৃত্বের এমন নিঃশব্দ আত্মত্যাগ সত্যিই বিস্ময়কর।

২০০৭ সালের মে মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের কাছে মন্টেরে ক্যানিয়নে এই অক্টোপাসটির সন্ধান পান মন্টেরে বে অ্যাকোয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৪০০ মিটার গভীরে একটি পাথুরে খাঁজে বসে ছিল গ্রেনেলডোন বরিওপ্যাসিফিকা প্রজাতির একটি স্ত্রী অক্টোপাস। তার কাছে ছিল প্রায় ১৬০টি ডিম। গবেষকেরা শরীরের বিশেষ ক্ষতচিহ্ন দেখে তাকে শনাক্ত করেছিলেন। এরপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।

পরবর্তী ৫৩ মাস ধরে বিজ্ঞানীরা বারবার সেই একই জায়গায় গিয়েছেন। এবং প্রতিবারই দেখেছেন, মা অক্টোপাসটি একইভাবে ডিমগুলিকে আগলে রয়েছে। সে ডিম ছেড়ে কোথাও যায়নি, এমনকি খাবার খেতেও দেখা যায়নি তাকে।

গভীর সমুদ্রের শীতল জল আর খাদ্যের অভাব তার জীবনকে ক্রমশ কঠিন করে তুলেছিল। আশপাশ দিয়ে কাঁকড়া ও চিংড়ি চলে গেলেও সে সেদিকে মন দেয়নি। গবেষকেরা ডুবোযানের যান্ত্রিক হাত দিয়ে খাবার এগিয়ে দিলেও সে তা গ্রহণ করেনি। তার সমস্ত মনোযোগ ছিল ডিমগুলির দিকে।

দিনের পর দিন সে ডিম পরিষ্কার করেছে, যাতে সেগুলির গায়ে ক্ষতিকর জীব জমতে না পারে। সম্ভাব্য শিকারিদের হাত থেকেও রক্ষা করেছে অনাগত সন্তানদের। এদিকে তার নিজের শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়েছে, পেশির পরিমাণ কমেছে, ধীর হয়ে এসেছে বিপাকক্রিয়া। তবু সে নিজের জায়গা ছেড়ে যায়নি।

কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে এই অপেক্ষা? গভীর সমুদ্রের অত্যন্ত ঠান্ডা জলে ডিমের ভ্রূণ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। দীর্ঘ বিকাশপর্বের ফলে বাচ্চারা তুলনামূলকভাবে পরিণত অবস্থায় ডিম থেকে বেরিয়ে আসে। এতে তাদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। মায়ের দীর্ঘ পাহারা শুধু অপেক্ষা ছিল না। সে ছিল সন্তানদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানোরও একটি উপায়।

২০১১ সালের অক্টোবরে গবেষকেরা আবার সেই জায়গায় ফিরে এলেন। কিন্তু এবার সেখানে মা অক্টোপাসটি নেই। পড়ে রয়েছে শুধু ছেঁড়া, খালি ডিমের খোলস। গবেষকদের ধারণা, তত দিনে ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে গিয়েছে।

অক্টোপাসের বহু প্রজাতির স্ত্রী সদস্য ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরপরই মারা যায়। এই অক্টোপাসটির ক্ষেত্রেও সম্ভবত তাই ঘটেছিল। তার জীবনের শেষ চার বছর পাঁচ মাস জুড়ে ছিল একটিই কাজ—নিজের সন্তানদের নিরাপদে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করা।

একটি জীবনের শেষ, বহু জীবনের শুরু। চার বছর পাঁচ মাস ধরে ডিম আগলে রাখার এই ঘটনা কোনও প্রাণীর ক্ষেত্রে ডিমে তা দেওয়ার দীর্ঘতম নথিবদ্ধ সময়কাল। গভীর সমুদ্রের সেই নিঃশব্দ অন্ধকারে মা অক্টোপাসটির জীবন শেষ হয়ে গেলেও তার অপেক্ষার ফল ছড়িয়ে পড়ল নতুন প্রজন্মের মধ্যে। একজন মায়ের কাছে তার সন্তানদের প্রকৃতিতে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম কখনও কখনও নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

 

সূত্র: Robison, B. H., et al. Deep-Sea Octopus (Graneledone boreopacifica) Conducts the Longest-Known Egg-Brooding Period of Any Animal. PLOS ONE.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × three =