মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও মাছের ফুলকা

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও মাছের ফুলকা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ জানুয়ারী, ২০২৬

আজ প্রায় প্রতি বাড়িতেই চলে এসেছে ওয়াশিং মেশিন নামক যন্ত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিবার ওয়াশিং মেশিন চালু হলেই কাপড়ের তন্তু ক্ষয়ে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা। এই কণাগুলি নর্দমা পেরিয়ে নদী, মাঠ ও খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে, যা মানুষসহ সমগ্র প্রাণীজগতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, একটি চার সদস্যের পরিবারের ওয়াশিং মেশিন থেকেই বছরে প্রায় ৫০০ গ্রাম মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই অদৃশ্য দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবার প্রকৃতির কাছ থেকেই এল এক অভিনব সমাধান। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বন–এর গবেষকরা মাছের ফুলকা বা গিল আর্চ সিস্টেম অনুকরণ করে এমন এক ফিল্টার তৈরি করেছেন, যা পরীক্ষায় ৯৯ শতাংশেরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক আটকে ফেলেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী এন পি জে এমার্জিং কন্টামিনান্টস -এ।

বর্তমান ওয়াশিং মেশিন ফিল্টারগুলির বড় সমস্যা হলো—সেগুলি দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছেঁকে ফেলতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতেই গবেষকরা নজর দেন এমন মাছের দিকে, যারা কোটি কোটি বছর ধরে জল ছেঁকে খাদ্য সংগ্রহ করছে অনায়াস দক্ষতায়।

ম্যাকারেল, সার্ডিন ও অ্যাঙকোভির মতো মাছ খাওয়ার সময় মুখ খুলে জল টানে। তাদের গিল আর্চ বা ফুলকা ধাপে ধাপে সরু হওয়া এক ধরনের ফানেল বা চোঙা আকৃতির ছাঁকনি। তার সূক্ষ্ম দাঁতের মতো গঠন প্ল্যাঙ্কটন আটকে রাখে, কিন্তু পরিষ্কার জল বেরিয়ে যায়। এই নকশার বড় সুবিধা হলো, কণা সরাসরি ধাক্কা খেয়ে আটকে যায় না, বরং গড়িয়ে নির্দিষ্ট দিকে চলে যায়। ফলে ছাঁকনি বন্ধ হয় না, বরং নিজেই পরিষ্কার থাকে।

এই নীতিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি ফিল্টারটিতে সূক্ষ্ম জালের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চোঙা-আকৃতির প্রবাহপথ। এতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়ে নির্দিষ্ট স্থানে জমা হয় এবং তাকে নিয়মিত সরিয়ে নেওয়া যায়। কয়েক ডজন বার ধোয়ার পর ছোট প্লাস্টিক পেলেট হিসেবে এগুলি ফেলে দেওয়াই যথেষ্ট।

যেহেতু এতে জটিল যান্ত্রিক অংশ নেই, তাই এই প্রযুক্তি কম খরচে উৎপাদনযোগ্য এবং ভবিষ্যতের ওয়াশিং মেশিনে সহজেই সংযুক্ত করা সম্ভব। বন বিশ্ববিদ্যালয়ের দল এবং ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল, সেফটি অ্যান্ড এনার্জি টেকনোলজি ইতিমধ্যে জার্মানিতে পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছে এবং ইউরোপীয় সংঘ-ব্যাপী পেটেন্ট এখন চলছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক ইতিমধ্যেই মানুষের প্লাসেন্টা, মাতৃ স্তন্য এমনকি মস্তিষ্কেও পাওয়া গেছে। সেই প্রেক্ষাপটে, মাছের ফুলকা অনুপ্রাণিত এই ফিল্টার শুধু এক বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব নয়। এটি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য রক্ষার পথে এক আশাব্যঞ্জক বার্তাও বটে। প্রকৃতির নকশা যে আধুনিক সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে, এই উদ্ভাবন তারই প্রমাণ।

 

সূত্র:  A self-cleaning, bio-inspired high retention filter for a major entry path of microplastics by Leandra Hamann, Christian Reuß,et.al; npj Emerging Contaminants, 2025; 1 (1) DOI: 10.1038/s44454-025-00020-2

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − two =