মাউন্ট আরারাতে বরফবন্দি সভ্যতার স্মৃতি 

মাউন্ট আরারাতে বরফবন্দি সভ্যতার স্মৃতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ আগষ্ট, ২০২৬

তুরস্কের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট আরারাতের হিমবাহে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালিয়েছে জার্মান ও তুরস্কের এক যৌথ গবেষকদল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,০০০ মিটার ওপরে প্রবল ঠান্ডা, তীব্র বাতাস এবং অত্যন্ত কম অক্সিজেনের মধ্যে জুলাই মাসে দুই সপ্তাহ ধরে চলে এই অভিযান। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল আরারাতের বরফের স্তরে অতীতের জলবায়ু ও মানুষের কর্মকাণ্ডের কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রমাণ সংরক্ষিত আছে কি না, তা খুঁজে বের করা। জার্মান-তুরস্ক এই যৌথ প্রকল্পটি গের্ডা হেনকেল ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

পৃথিবীর উষ্ণায়নের ফলে আরারাতের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে বরফের মধ্যে জমে থাকা সম্ভাব্য প্রাকৃতিক ও মানবসভ্যতার ইতিহাস চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই বরফের এই বিপন্ন প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগারকে দ্রুত নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা রেডিও ইকো সাউন্ডিং এবং সক্রিয় সাইসমিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হিমবাহের বরফের পুরুত্ব ও তার নীচের ভূভাগের আকৃতি নির্ণয় করেছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা ঠিক করেছেন, ভবিষ্যতে কোথায় ড্রিলিং করলে সবচেয়ে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক বরফের স্তর পাওয়া যেতে পারে। পরবর্তী অভিযানে সেই স্থান থেকে বরফ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সফল হলে সেটিই হবে মাউন্ট আরারাত থেকে সংগৃহীত প্রথম বরফের নমুনা।

গবেষকদের আশা, বরফের প্রতিটি স্তর অতীতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিবেশের সাক্ষ্য বহন করতে পারে। সেখানে বায়ুমণ্ডলের প্রাচীন রাসায়নিক গঠন, বাতাসে ভেসে আসা ধূলিকণা এবং অতীতের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকতে পারে। একই সঙ্গে এই বরফ থেকে রোমান ক্লাইমেট অপটিমাম এবং লেট অ্যান্টিক লিটল আইস এজ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুপর্ব এই অঞ্চলে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, তারও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

তবে আরারাতের বরফের গুরুত্ব শুধু জলবায়ু গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। পর্বতটি এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে আনাতোলিয়া, মেসোপটেমিয়া ও ককেশাসের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ঘটেছিল। বরফে সেই প্রাচীন মানব কর্মকাণ্ডের সূক্ষ্ম চিহ্নও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাচীন ধাতু গলানোর চুল্লি থেকে নির্গত ক্ষুদ্র ধাতব কণা কিংবা প্রাচীন কৃষিকাজ ও বন পরিষ্কারের অবশিষ্টাংশ বরফের স্তরে জমে থাকতে পারে।

গবেষকদের মতে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে আরারাতের হিমবাহের পার্বত্য জলবায়ুর ইতিহাস ছাড়াও এটি সমগ্র অঞ্চলের মানবসভ্যতা, কৃষি, ধাতুবিদ্যা ও পরিবেশ পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: Scientists Survey Mount Ararat’s Mysterious Glacier for the First Time, By University of Münster, August 15th , 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × one =