মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়ামে পাল্টাচ্ছে মস্তিষ্কের রসায়ন

মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়ামে পাল্টাচ্ছে মস্তিষ্কের রসায়ন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ নভেম্বর, ২০২৬

শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। কিন্তু, কোনো কিছুই অতি বাড়াবাড়ি ভালো না। শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রামকে উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ব্যায়াম করলে তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পারে মস্তিষ্কের উপরে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দীর্ঘদিন অত্যধিক শারীরিক পরিশ্রম করলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই পরিবর্তন অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে ঘুমের সমস্যা ও উদ্বেগ তৈরির সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই পরীক্ষাটি চালান। গবেষণায় ইঁদুরদের প্রথমে ট্রেডমিলে দৌড়ানোর অভ্যাস করানো হয়। এরপর টানা আট সপ্তাহ ধরে তাদের ব্যায়ামের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়। প্রথম দিকে প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট দৌড়ালেও শেষ সপ্তাহে দিনে দুবার ৭৫ মিনিট করে দৌড়াতে হয় তাদের। দুটি দৌড়ের মধ্যে বিশ্রামের ব্যবধান ছিল মাত্র চার ঘণ্টা। এমনকি পঞ্চম সপ্তাহ থেকে ট্রেডমিলের ঢাল ১৪ শতাংশ নীচের দিকে রাখা হয়, যাতে পেশির উপর আরও বেশি চাপ পড়ে।
দেখা যায়, মাঝামাঝি সময়ে ইঁদুরগুলির শারীরিক সক্ষমতা বাড়লেও আট সপ্তাহের শেষে সেই উন্নতি আর বজায় থাকেনি। অর্থাৎ, অতিরিক্ত পরিশ্রমে তাদের কর্মক্ষমতা বরং কমে গিয়েছিল।
এরপর গবেষকেরা ইঁদুরগুলির মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশ পরীক্ষা করেন। স্মৃতিশক্তি, মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে ডোপামিন রাসায়নিকের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ইঁদুরগুলির বিশ্রামের সময় দুপুরে এই পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। ডোপামিনের পাশাপাশি এটি তৈরিতে সাহায্যকারী টাইরোসিন হাইড্রক্সিলেজ নামের উৎসেচকের মাত্রাও বেড়েছিল। অন্যদিকে, ঘুম ও ক্লান্তি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সেরোটোনিনের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি।
একবার কঠিন ব্যায়াম করার পরেও ইঁদুরের মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বেড়েছিল। তবে তখন ডোপামিন তৈরির সঙ্গে যুক্ত উৎসেচকের মাত্রা কমে যায়। গবেষকদের ধারণা, তাৎক্ষণিক শারীরিক ক্লান্তির সঙ্গে এই পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ডোপামিন ও সংশ্লিষ্ট উৎসেচক—দুটিরই মাত্রা বেড়েছে, যা মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এই গবেষণাটি থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। আমাদের ধারণা ছিল, ব্যায়ামের সময় সেরোটোনিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ক্লান্তি তৈরি হয় এবং মানুষ ব্যায়াম থামাতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই পরীক্ষায় সেই ধারণার সমর্থনে প্রমাণ মেলেনি। বরং ডোপামিন ও সেরোটোনিনের পারস্পরিক ভারসাম্যের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরীক্ষায় ইঁদুরের ঘুম, উদ্বেগ বা সতর্কতার মাত্রা সরাসরি মাপা হয়নি। নমুনার সংখ্যাও ছিল কম এবং সব ইঁদুরই ছিল পুরুষ। তাই মানুষের ক্ষেত্রে একই পরিবর্তন ঘটে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণাটির বিবরণ বিস্তারিতভাবে নিউরোসায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ব্যায়ামের সুফল পেতে হলে শুধু পরিশ্রম করলেই হয় না, শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়াও জরুরি। কারণ, অতিরিক্ত ব্যায়াম শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: Exercise is good for your brain, but too much may alter its chemistry, Neuroscience.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + 17 =