পৃথিবীতে একটি মোমবাতির শিখার আকার মূলত অশ্রুবিন্দুর মতো লম্বাটে। মনে হয়, আগুন যেন স্বভাবতই উপরের দিকে ওঠে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। শিখার এই পরিচিত আকৃতির পেছনে রয়েছে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ এবং তার প্রভাব জনিত সংবহন ।
মোমবাতিতে জ্বালানি পুড়লে অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাস তৈরি হয়। তুলনামূলকভাবে হালকা এই গ্যাস উপরের দিকে উঠে যায় এবং তার জায়গা নিতে নীচ থেকে প্রবেশ করে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাস। এই ক্রমাগত বায়ুপ্রবাহ শিখাকে টেনে লম্বাটে করে তোলে। অর্থাৎ, পৃথিবীতে আমরা যে আগুনের আকার দেখি, তার একটি বড় অংশই আসলে মাধ্যাকর্ষণ-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ফল।
এই ধারণাটিই আরও পরিষ্কার হয় যখন আগুনকে নিয়ে যাওয়া হয় মহাকাশে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন-এর অতি সামান্য মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে মাধ্যাকর্ষণের টান অত্যন্ত কম থাকায় স্বাভাবিক সংবহন অনেকটাই দুর্বল হয়ে যায়। ফলে আগুন আর পৃথিবীর মতো ওপরের দিকে উঠে যেতে পারে না। বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জ্বালানির চারপাশে তৈরি হতে পারে প্রায় নিখুঁত এক গোলাকার শিখা। মনে হয় যেন জ্বালানিকে বুঝি ঘিরে আছে ক্ষুদ্র এক জ্বলন্ত গোলক।
শুধু আকৃতিই নয়, মহাকাশে শিখার রং ও দহনপ্রক্রিয়াতেও দেখা যায় পরিবর্তন। পৃথিবীর সাধারণ হলুদ শিখার উজ্জ্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো অত্যন্ত উত্তপ্ত কালির কণা। কিন্তু অতি সামান্য গ্র্যাভিটিতে দহনের ধরন বদলে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কম কালির কণা তৈরি হয়। ফলে শিখা হলুদের বদলে খুব ক্ষীণ নীল আভা ধারণ করতে পারে। এই নীল শিখা তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার দহনের ইঙ্গিতও দেয়।
মহাকাশে এই ক্ষুদ্র, অদ্ভুত শিখাগুলি নিয়ে নাসার গবেষণার উদ্দেশ্য হল দহন কীভাবে কাজ করে তা আরও গভীরভাবে জানা। এ জ্ঞান ভবিষ্যতে মহাকাশযান ও মহাকাশ স্টেশনে অগ্নিনিরাপত্তা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে এই গবেষণা পৃথিবীতে জ্বালানি পোড়ানোর প্রক্রিয়াকে আরও পরিষ্কার, দক্ষ ও সুনিয়ন্ত্রিত করার নতুন ধারণাও দিতে পারে।
পৃথিবীর পরিচিত অশ্রুবিন্দুর মতো শিখা হয়তো আগুনের মৌলিক আকৃতি নয়। সেটি আসলে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে গড়া আগুনের শিখার একটি বিশেষ রূপ। মহাকাশে সেই প্রভাব সরিয়ে গেলে আগুন অন্য চেহারা প্রকাশ করে।
সূত্র: What if the shape of a flame isn’t really the shape of fire? SpaceScience NASA ScienceIsAmazing, Image credit: NASA.
