আপনি হয়তো ভাবেন, আপনার শরীরটা পুরোপুরি আপনারই। কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞান বলছে, আমাদের শরীরের ভিতরে বাস করে এমন কিছু কোষ, যেগুলি আমাদের নিজের নয়। তারা এসেছে অন্য মানুষের শরীর থেকে। হয়তো সবচেয়ে কাছের মানুষদের থেকেই। মা, সন্তান, এমনকি দিদিমা বা যমজ ভাইবোন থেকেও হতে পারে। এই ঘটনাকে বলে ‘মাইক্রোকাইমেরিজম’ , অর্থাৎ এক শরীরে বহু উৎস থেকে আসা কোষের সহাবস্থান। এই নামের তাৎপর্য কী ? গ্রিক পুরাণের কাইমেরা ভয়ংকর এক প্রাণী। তার নাকি সিংহের মাথা, ছাগলের দেহ আর সাপের লেজ। আজকের বিজ্ঞান বলছে, মানুষও এক অর্থে কাইমেরা-ই। তবে রূপকথার মতো নয়, কোষের স্তরে। গর্ভাবস্থায় মা ও সন্তানের মধ্যে শুধু পুষ্টি নয়, কোষেরও আদানপ্রদান হয়। গর্ভনাড়ির মধ্য দিয়ে সন্তানের কিছু কোষ মায়ের শরীরে ঢুকে পড়ে। আবার মায়ের কোষও যায় সন্তানের শরীরে। আশ্চর্যের বিষয়, এইসব কোষের অনেকগুলিই আজীবন থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মায়ের শরীরে তাঁর সন্তানের কোষ পাওয়া গেছে সন্তান জন্মের ২০–৩০ বছর পরেও। মায়ের শরীরে এমন কোষও মিলেছে, যা এসেছে তাঁর নিজের মায়ের দিক থেকে। অর্থাৎ দিদার কোষ মায়ের দেহ হয়ে, নাতির শরীরে এসেছে। সংখ্যায় তারা খুব কম। প্রতি ১০ হাজার থেকে ১০ লক্ষ নিজের কোষে মাত্র একটি বহিরাগত কোষ। কিন্তু তার প্রভাব অনেক বড়।
এই অদ্ভুত কোষগুলির গল্প শুরু হয় প্রায় হঠাৎই। উনিশ শতকের শেষ দিকে জার্মান প্যাথোলজিস্ট জর্জ স্মর্ল গর্ভাবস্থাজনিত জটিলতায় মৃত নারীদের ফুসফুসে কিছু অদ্ভুত “দৈত্যাকার কোষ” খুঁজে পান। সেগুলি গর্ভনাড়ির কোষের মতো দেখতে। তখনই প্রথম ধারণা তৈরি হয়, গর্ভের সন্তান হয়তো মায়ের শরীরে কোষ পাঠাচ্ছে। এরপর ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানীরা গর্ভবতী নারীদের রক্তে Y ক্রোমোজোমযুক্ত কোষ খুঁজে পান, যা শুধু পুরুষ সন্তানের ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। তবু দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হয়েছিল, এই কোষগুলো অচিরস্থায়ী। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে জিনতত্ত্ববিদ ডায়ানা বিয়াঙ্কির গবেষণা সেই প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেয়। তিনি দেখান, বহু বছর আগে পুত্রসন্তানের জন্ম-দেওয়া নারীদের শরীরেও সেই সন্তানের কোষ সক্রিয়ভাবে রয়ে গেছে। এদিকে ইমিউনোলজির পাঠ্যবই বলে, শরীর “নিজের” আর “পরের” কোষ আলাদা করে চিনে রাখে, পরের কোষ দেখলেই আক্রমণ হানে। কিন্তু ‘মাইক্রোকাইমেরিক কোষ’ এই নিয়ম মানে না। তারা শরীরের ভিতরেই থাকে, কোনো যুদ্ধ ছাড়াই। এতেই প্রশ্ন উঠেছে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কি সত্যিই এতটা সাদা – কালো ভাগে বিভক্ত? নাকি তার “নিজস্ব” আর “অপর”-এর মাঝখানে কিছু ধূসর এলাকা আছে? এই প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্ক্লেরোডার্মা, লুপাস বা ডায়াবেটিস প্রভৃতি অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগীদের শরীরে ‘মাইক্রোকাইমেরিক কোষে’-র সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, এই কোষগুলি কখনও রোগ উসকে দেয়, আবার কখনও রোগ থেকে রক্ষাও করতে পারে।
তবে গল্পটা শুধু মায়ের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানও মায়ের কোষ বহন করে। ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসায় এর নাটকীয় প্রমাণ পাওয়া গেছে। এক কিশোরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, দাতা তার মা। কিছুদিন পর সে নিজের ইমিউন-দমনকারী ওষুধ বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন, এর ফলে প্রতিস্থাপিত অঙ্গ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, কিছুই হয়নি। পরে জানা যায়, সেই কিশোরের শরীরে আগে থেকেই মায়ের কোষ ছিল। তাই তার ইমিউন সিস্টেম মায়ের কিডনিকে “অপর” মনে করেনি। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের নিয়মই বদলে দিতে পারে। এই কোষগুলি শুধু সহাবস্থান করে না, কাজও করে। ক্ষত সারাতে সাহায্য করতে পারে। রক্তনালি তৈরি করতে পারে। এমনকি রোগ প্রতিরোধেও ভূমিকা পালন করে। বিস্ময়কর দিক হলো, মায়ের কিছু ইমিউন কোষ সন্তানের শরীরে ঢুকে আগেভাগেই “শিখিয়ে দেয়” কোন জীবাণু বিপজ্জনক। যেন গর্ভের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় রোগ প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ।
এই সব তথ্য এক গভীর প্রশ্ন সামনে আনে, আমরা কি সত্যিই একক সত্তা? নাকি আমরা বহু মানুষের কোষের সমষ্টি? যদি আমাদের শরীরে অন্যের কোষ আজীবন বেঁচে থাকে, তাহলে “আমি” শব্দটার অর্থ কী? বিজ্ঞান এখনও এর চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু বিষয়টা স্পষ্ট। মা–সন্তানের সম্পর্ক শুধু আবেগের নয়, কোষেরও। ‘মাইক্রোকাইমেরিজম’ আমাদের শেখাচ্ছে, মানব শরীর কোনো একক দুর্গ নয় – তা এক প্রবহমান জৈব ইতিহাস। সেখানে প্রাণ এক শরীর থেকে আরেক শরীরে নীরবে বয়ে চলে।
সূত্র : The cells we carry from our mothers and beyond; Science in culture
