মানবশিশুর অসহায়ত্বের ব্যাখ্যা 

মানবশিশুর অসহায়ত্বের ব্যাখ্যা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ আগষ্ট, ২০২৬

২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে গবেষণার সময় জাপানের নৃতত্ত্ববিদ ইয়োসুকে কাইফুর চোখে পড়ে বিখ্যাত LB1 জীবাশ্ম “ফ্লো”-র মাথার খুলি। আবিষ্কৃত এই জীবাশ্মটিই মানুষের ক্ষুদ্রাকৃতি পূর্বাত্মীয় হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস-এর অস্তিত্ব সামনে আনে। প্রায় এক মিটার লম্বা এই ‘হবিট’রা ৫০ হাজার বছর আগেও ফ্লোরেসে বাস করত। কাইফুর নজর পড়ে খুলির ডান দিকের সামান্য চ্যাপ্টাভাবের দিকে। অনেকের ধারণা ছিল, এটি রোগের কারণে হয়েছে। কেউ আবার বলেছিলেন, মাটির নীচে চাপা পড়ে খুলিটি বিকৃত হয়ে গেছে। কিন্তু জাপানের এক চিকিৎসক জানান, এটি সম্ভবত ‘ডিফর্মেশনাল প্ল্যাজিওসেফালি’। এ হল শিশুর মাথার এক পাশ চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ার পরিচিত এক অবস্থা। জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস শিশুর খুলি নরম থাকে এবং মস্তিষ্ক দ্রুত বাড়ে। নিজের মাথা সোজা করে ধরে রাখতে না পেরে একই দিকে মাথা রেখে শোয়ার ফলে চাপে খুলির একটা পাশ চ্যাপ্টা হয়ে যায়। কাইফুর মনে প্রশ্ন জাগে, প্রাচীন মানুষের খুলিতেও এমন চ্যাপ্টাভাব থাকার অর্থ কি এই যে তারাও জন্মের পর আধুনিক শিশুর মতোই অসহায় ছিল? এর উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা হোমো স্যাপিয়েন্স-এর ৫০৮টি এবং শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বনোবো ও ওরাংওটাং-সহ ৯৯৬টি খুলি বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, এই ধরনের চ্যাপ্টাভাব এদের তুলনায় মানুষের মধ্যে অনেক বেশি। এরপর এক লাখ থেকে তিন লাখ বছরের পুরনো হোমো ইরেক্টাস-এর পাঁচটি খুলি পরীক্ষা করে তার মধ্যে দুটিতে ঐ একই বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এগুলি জীবাশ্ম হওয়ার সময়ের ক্ষতির ফল নয়। হোমো স্যাপিয়েন্স, হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস এবং হোমো ইরেক্টাস- এই তিন মানবগোষ্ঠীর মধ্যেই একই বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাওয়ায় এই ধারণা জোরালো হয় যে মানুষের শিশুকালের অসহায়ত্বের ইতিহাস বহু লক্ষ বছরের পুরনো। তবে গবেষকেরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। কারণ প্রাচীন যুগে শিশুরা আজকের মতো দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকত কি না, তা জানা কঠিন। বরং তাদের প্রায়ই কোলে নিয়ে ঘোরানো হতো বলেই ধারণা করা হয়। তবু খুলির এই সামান্য অসমতাই অতীতের এক গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী মেলে ধরছে। প্রাচীন শিশুদের খেলনা, পোশাক বা দোলনা আমাদের হাতে নেই, আছে শুধু তাদের জীবাশ্ম। আর সেই জীবাশ্মের চিহ্ন জানাচ্ছে, আজকের মতোই বহু প্রাচীন মানুষের শিশুরাও বড় হয়ে উঠতে অন্যের যত্ন ও সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

 

সূত্র : 10.1126/science.z69427z ; 2026 American Association for the Advancement of Science.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + three =