মানসিক চাপ ও রক্ত তঞ্চন 

মানসিক চাপ ও রক্ত তঞ্চন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ জুলাই, ২০২৬

মানসিক চাপ হৃদ্‌রোগের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ। সেই ঝুঁকিটা ঠিক কীভাবে তৈরি হয়, সেটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল গবেষণা। এখন বিজ্ঞানীরা মন ও শরীরের সম্পর্ক বিষয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে একটা অন্য ভাবনা সামনে এনেছেন। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র মানসিক চাপের মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই রক্ত জমাট বাঁধার অণুবীক্ষণিক গঠন বদলে যেতে পারে। এর ফলে রক্ত অস্বাভাবিকভাবে জমাট বাঁধার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য জার্নাল অফ ফিজিওলজিতে। কয়েকজন সুস্থ তরুণ স্বেচ্ছাসেবকের উপর গবেষকেরা প্রয়োগ করেন ট্রিয়ার সোশ্যাল স্ট্রেস টেস্ট। এটি মনোবিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত একটি পরীক্ষাপদ্ধতি, যা স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিচারকদের সামনে তাৎক্ষণিক বক্তৃতা দিতে এবং জটিল মানসিক গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে হয়। পরীক্ষার আগে ও পরপরই তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়।

দেখা গেছে, মানসিক চাপের পর রক্তে মুক্ত মূলক বা অত্যন্ত বিক্রিয়াশীল অক্সিজেনজাত অণুর পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। এসব অণু শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে, যা কোষের ক্ষতির পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গবেষকেরা দেখেছেন মানসিক চাপ রক্তকে শুধু সাময়িকভাবে ঘন করে তোলে না, এটি রক্ত জমাটের কাঠামোকেই বদলে দেয়। চাপের পরে তৈরি হওয়া জমাট ডেলাগুলো আগের তুলনায় বড়, অনেক বেশি ঘন এবং ফাইব্রিন নামের প্রোটিন তন্তু দিয়ে আরও শক্তভাবে বোনা থাকে। ফাইব্রিনই রক্ত জমাটের মূল কাঠামো তৈরি করে। এই তন্তুগুলো যত ঘন ও দৃঢ় হয়, জমাট তত বেশি শক্তিশালী হয় এবং সহজে ভাঙে না।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, মানসিক চাপ অভ্যন্তরীণ তঞ্চন বা ইনট্রিনসিক কোয়াগুলেশনের পথ সক্রিয় করে, যার ফলে রক্ত অতিতঞ্চনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, শরীরের প্রয়োজন না থাকলেও রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, এই পরিবর্তন ঘটতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। অর্থাৎ মানুষের মানসিক অবস্থা সরাসরি জৈব-রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে রক্তের ভৌত বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, মাত্র একবারের অতিরিক্ত চাপ সাধারণত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঘটায় না। কিন্তু যদি প্রতিদিনের জীবনে এমন তীব্র মানসিক চাপ বারবার ফিরে আসে, তাহলে তা ধীরে ধীরে রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে এবং হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই গবেষণা মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। বিশেষ করে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস যে এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি কেন্দ্রীয় নিয়ামক, তা এখন আরও স্পষ্ট। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, ধ্যান, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিবার-বন্ধুদের সামাজিক সহায়তা—এসব শুধু মানসিক স্বস্তিই দেয় না, হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এদের ভূমিকা কার্যকর হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মন ও শরীরের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে বোঝা গেলে ভবিষ্যতে উচ্চ মানসিক চাপের পরিবেশে কর্মরত মানুষ কিংবা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য আরও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ওষুধ ও চিকিৎসা প্রণালী তৈরি করা সম্ভব হবে।

সূত্র: The Conversation article on recent study published in The Journal of Physiology.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − twelve =