মানুষ-বন্যপ্রাণী সম্পর্কের ভারসাম্য 

মানুষ-বন্যপ্রাণী সম্পর্কের ভারসাম্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ মার্চ, ২০২৬

ইতিহাসের পাতায় পাতায় মনুষ্য প্রজাতিকে খাদ্যশৃংখলে পৃথিবীর শীর্ষ শিকারি বা “সুপার-প্রিডেটর’’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কারণ শিকার, ফাঁদ পাতা এবং মাছ ধরা—এই সব কার্যকলাপ মানুষ এতো বিশাল পরিসরে করেছে, যা অন্য কোনো প্রাণী কখনো করেনি। এই দীর্ঘদিনের শিকারের চাপ বহু প্রাণীর আচরণ ও বাস্তুতন্ত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (আই আই এস সি)–এর সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল সায়েন্সেস-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে, বন্য প্রাণীরা যে সব সময় মানুষকে ভয় পায় এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। বাস্তবতা আসলে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল ।

গবেষকরা প্রায় ৩০ বছরের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বড় মেটা-অ্যানালিসিস পরিচালনা করেছেন। এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান পত্রিকা ইকোলজি লেটার্সে। এই বিশ্লেষণে দেখা হয়েছে, মানুষকে বনের মধ্যে দেখলে বিভিন্ন প্রাণী তাদের আচরণ কীভাবে বদলায়। বিশেষ করে খাদ্য সংগ্রহ, সতর্কতা এবং চলাফেরার ধরণে কী ধরনের পরিবর্তন আসে।

দেখা গেছে প্রাণীরা মানুষকে সবসময়ই যে হুমকি হিসেবে নেয় তা নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদা আলাদা ভাবে মূল্যায়ন করে। যখন মানুষ সরাসরি প্রাণীদের জন্য প্রাণঘাতী হুমকি সৃষ্টি করে, যেমন শিকারি বা জেলেদের ক্ষেত্রে, তখন কিন্তু প্রাণীরা অত্যন্ত সতর্ক হয়ে যায়। তখন তারা বেশিরভাগ সময় চারপাশে নজরদারি করে এবং খুব কম সময় খাবার খোঁজে। কিন্তু যখন মানুষ কেবল পর্যটক, গবেষক বা সাধারণ পথচারী হিসেবে উপস্থিত থাকে, তখন প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া অনেক স্বাভাবিক থাকে অর্থাৎ খুব বেশি সতর্কতা তাদের মধ্যে থাকে না।

গবেষণায় আরও একটি আশ্চর্যজনক বিষয় দেখা গেছে। অনেক সময় রাস্তা, বসতি বা মানুষের আশেপাশের এলাকা কিছু প্রাণীর কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে হতে পারে। কারণ অনেক বড় শিকারি প্রাণী সাধারণত মানুষের কাছাকাছি আসতে চায় না। ফলে ছোট বা মাঝারি আকারের কিছু শিকারি প্রাণী মানুষের কাছাকাছি এলাকায় তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বোধ করতে পারে। তবে এই এলাকায় আবার অন্য ধরনের ঝুঁকি থাকে, যেমন গাড়ির ধাক্কায় মৃত্যুর সম্ভাবনা।

গবেষকরা প্রাণীদের তিনটি প্রধান আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন: খাদ্যগ্রহণ, সতর্কতা এবং চলাফেরা। এই আচরণগুলো থেকে দেখা যায় যে প্রাণীরা কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজন, এ দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। কারণ বেশি সতর্ক থাকা মানে কম সময় ধরে খাবার সংগ্রহ করা, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের শক্তি ও প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

গবেষকরা এই ফলাফলের সঙ্গে “রিস্ক অ্যালোকেশন হাইপোথিসিস’’ নামে পরিচিত একটি তত্ত্বের মিল খুঁজে পেয়েছেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী প্রাণীরা নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করে হুমকির তীব্রতা ও কতটা পূর্বানুমান করা যায় তার উপর ভিত্তি করে।

গবেষকদের মতে, এই ধরনের আচরণগত পরিবর্তন পুরো বাস্তুতন্ত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, শিকারি-শিকার সম্পর্ক, উদ্ভিদের উপর চারণ-চাপ এবং সামগ্রিক পরিবেশগত স্থিতিশীলতা। তাই মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমাতে এবং সংরক্ষণ নীতিমালা তৈরি করতে এই ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

সূত্র: “Are Human Super-Predators Always Super-Scary? A Meta-Analysis of Wild Animal Behavioural Responses to Human Interactions” by Shawn Dsouza, Kartik Shanker and Maria Thaker, 26th December 2025, published in “Ecology Letters”.

DOI: 10.1111/ele.70287

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + twenty =