১৯৬৯ সালের অ্যাপেলো ১১-এর চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের মুহূর্তটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক সত্যই যুগান্তকারী মুহূর্ত। এই অভিযানের মাধ্যমেই প্রথমবার মানুষ পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো জ্যোতির্বস্তুর মাটিতে পা রাখে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর থেকেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক দশক ধরে কিছু মানুষ দাবি করে এসেছেন যে আসলে চাঁদে অবতরণ ছিল সাজানো ঘটনা বা একটি ষড়যন্ত্র। কিন্তু নতুন করে বিশ্লেষিত বৈজ্ঞানিক তথ্য, সংরক্ষিত নথি এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণ আবারও স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে অ্যাপোলো ১১ মিশন সম্পূর্ণ বাস্তব ছিল এবং মানুষ সত্যিই চাঁদে গিয়েছিল।
অভিযানে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অল্ড্রিন চাঁদের মাটিতে অবতরণ করেন, আর মাইকেল কলিন্স চাঁদের কক্ষপথে অবস্থান করেন। পৃথিবীতে ফেরার সময় মহাকাশচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২১ কিলোগ্রাম শিলা ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে আনেন। বিজ্ঞানীরা আজও সেই “চান্দ্র শিলা” নিয়ে গবেষণা করছেন। এসব পাথরের রাসায়নিক গঠন পৃথিবীর পাথর থেকে ভিন্ন এবং চাঁদের পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণাগার এই নমুনা পরীক্ষা করে একই ধরনের ফল পেয়েছে।
চাঁদে মানুষের অবতরণের আরেকটি শক্তিশালী প্রমাণ হলো লেজার রেট্রোরিফ্লেক্টর। অ্যাপোলো মিশনের সময় চাঁদের পৃষ্ঠে বিশেষ ধরনের প্রতিফলক বসানো হয়েছিল। আজও পৃথিবী থেকে লেজার রশ্মি পাঠিয়ে সেই প্রতিফলকের সাহায্যে পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপা হয়। যদি মানুষ কখনও চাঁদে না যেত, তাহলে এই যন্ত্রগুলো সেখানে থাকার প্রশ্নই উঠত না।
এছাড়া, সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী মহাকাশ সংস্থা স্বাধীনভাবে অ্যাপোলো ১১ মিশন পর্যবেক্ষণ করেছিল। তখন ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের সময়, এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ভুল তথ্য প্রমাণ করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। কিন্তু তারাও কখনও এই মিশনকে ভুয়ো বলে দাবি করেনি। বরং তাদের পর্যবেক্ষণ অভিযানের সত্যতাকেই সমর্থন করেছে।
এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে প্রায়ই দুটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এক, চাঁদে আমেরিকার পতাকা নড়ছিল কেন? এবং দুই, ছবিতে তারা দেখা যায়নি কেন। বিজ্ঞানীরা তাঁদের সাধ্যমতো এই প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, পতাকাটি মহাকাশচারীদের স্পর্শ ও স্থাপনের সময় সৃষ্ট কম্পনের কারণে দুলছিল। চাঁদে বাতাস না থাকায় সেই কম্পন কিছু সময় স্থায়ী হয়। আর তারাগুলো ছবিতে না দেখানোর কারণ ছিল ক্যামেরার এক্সপোজার সেটিং। চাঁদের উজ্জ্বল পৃষ্ঠের ছবি ঠিক ভাবে তুলতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ আলোর তারাগুলো ছবিতে ধরা পড়েনি।
বর্তমানে চাঁদের কক্ষপথে থাকা আধুনিক মহাকাশযানের তোলা উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতেও অ্যাপোলো মিশনের অবতরণস্থল, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং মহাকাশচারীদের রেখে যাওয়া চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এসব প্রমাণ একত্রে বৈজ্ঞানিক সমাজের দীর্ঘদিনের ঐকমত্যকে আরও শক্তিশালী করেছে। মানুষ সত্যিই চাঁদে গিয়েছিল, এবং NASA-এর অ্যাপোলো কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ছয়বার সফলভাবে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করা হয়েছিল। এবং বর্তমানেও আর্টেমিস কর্মসূচির মাধ্যমে আবারও মানুষকে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
সূত্র: Institute of physics.
