মানুষের বিশ্ববিস্তারের মূলে আছে তার কৃষ্টি 

মানুষের বিশ্ববিস্তারের মূলে আছে তার কৃষ্টি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ আগষ্ট, ২০২৬

আজ থেকে প্রায় তিন লাখ বছর আগে আফ্রিকায় হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাব হয়েছিল। যদিও বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসের নিরিখে সময়টা খুব বেশি নয়, কিন্তু চমক তো এখানেই। এত অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এমন অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে, যা অন্য কোনো প্রাণী পারেনি। এর মধ্যেই মানুষ বরফে আচ্ছাদিত সুমেরু থেকে তপ্ত মরুভূমি, ঘন অরণ্য থেকে সুউচ্চ পর্বতমালা— বলতে গেলে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বাসযোগ্য অঞ্চলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস (পি এন এ এস)-এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা অনুসারে মানুষের এই দ্রুত বিস্তারের কারণ হল তার কৃষ্টিগত বিবর্তন, জৈবিক বিবর্তন নয়।

সাধারণত কোনো প্রাণী নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে হলে তাকে জিনগত পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে অভিযোজিত হতে হয়। এই জৈবিক বিবর্তনের গতি অত্যন্ত ধীর। আবার, একটি নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রায়ই লাখ থেকে কোটি বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এ কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন পরিবেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অসংখ্য প্রাণী ও প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে।

কিন্তু মানুষ এই নিয়মের বাইরে এক অনন্য পথ তৈরি করেছে। মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও আচরণ স্থানান্তরের ক্ষমতা। এই সঞ্চিত কৃষ্টি মানুষের অভিযোজনকে ত্বরান্বিত করেছে। আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পশুর চামড়া দিয়ে পোশাক তৈরি, উন্নত শিকার সরঞ্জাম, নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণ, ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান আদান-প্রদান এবং সামাজিক সহযোগিতা প্রভৃতি উদ্ভাবন মানুষকে দ্রুত নতুন পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ দেয়। ফলে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শরীরের জিনগত পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি; প্রযুক্তি ও সামাজিক জ্ঞানই সেই ঘাটতি পূরণ করেছে।

গবেষকেরা হাজার হাজার স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিবর্তনী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যদি মানুষ কেবল জৈবিক বিবর্তনের ওপর নির্ভর করত, তবে আজকের মতো বিশ্বজোড়া বিস্তার অর্জন করতে প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ বছর সময় লাগত। সেই দীর্ঘ সময়ে মানুষের বংশধারা বিভক্ত হয়ে অন্তত ২,২০০টিরও বেশি পৃথক প্রজাতিতে রূপ নিত। কেউ হতো সুমেরুর জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত, কেউ মরুভূমির জন্য, আবার কেউ উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলের জন্য। তাদের দেহের আকার, গঠন ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যেও থাকত ব্যাপক পার্থক্য।

বাস্তবে অবশ্য তেমন কিছুই ঘটেনি। পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশে বিস্তার লাভ করেছে একই প্রজাতির মানুষ। দেখা গেছে, মানুষের কৃষ্টি ঘটিত বিবর্তন জৈবিক বিবর্তনের তুলনায় শতগুণেরও বেশি দ্রুত অভিযোজনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ যে পরিবর্তন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটতে লাখ লাখ বছর লাগত, মানুষ তা কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্ভব করেছে।

গবেষকদের মতে, মানুষের সাফল্যের ভিত্তি অবশ্যই জৈবিক বিবর্তন, যা আমাদের উন্নত মস্তিষ্ক, শেখার ক্ষমতা ও সামাজিক আচরণের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে সভ্যতার প্রকৃত চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে কৃষ্টিগত বিবর্তন। জ্ঞানকে সংরক্ষণ, উন্নত করা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার এই অসাধারণ ক্ষমতাই মানুষকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে অভিযোজনক্ষম ও সফল প্রজাতিতে পরিণত করেছে। আসলে, মানুষের প্রকৃত শক্তি শুধু শরীরে নয়, তার জ্ঞান, সহযোগিতা এবং কৃষ্টির ধারাবাহিক বিকাশে নিহিত।

সূত্র: Charles Perreault, “Cultural evolution accelerated human range expansion by more than two orders of magnitude,” Proceedings of the National Academy of Sciences (2026). Reported in Scientific American.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + 7 =