মানুষের লেজ হারানোর ইতিহাস

মানুষের লেজ হারানোর ইতিহাস

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

অনেক প্রাণীরই লেজ আছে। বিড়াল থেকে শুরু করে বিশাল তিমি। এদের লেজের গঠন ও কাজ ভিন্ন ভিন্ন। যেমন, ওপোসামের লেজ জিনিস আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করে, ক্যাঙ্গারুর লেজ ভারসাম্য বজায় রাখে, মাছের লেজ সাঁতারে সাহায্য করে। লেজ প্রাণীর আবেগকেও প্রকাশ করে। যেমন খুশিতে কুকুরের লেজ নাড়া। দেহের পেছনে লেজ থাকা মেরুদণ্ডী বা তার পূর্বসূরি প্রাণীগোষ্ঠীর এক বৈশিষ্ট্য। মানুষও এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, কারণ আমরা মেরুদণ্ডী। অথচ বর্তমানে মানুষের কোনো লেজ দেখা যায় না। ভ্রূণ অবস্থায় প্রায় আট সপ্তাহ পরই তা মিলিয়ে যায়। আমাদের নিকট আত্মীয় প্রাইমেটদেরও তাই। অনেক পুরোনো। মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্যারল ওয়ার্ডের মতে, “মানুষের লেজ নেই, কারণ আমাদের পূর্বপুরুষদেরও লেজ ছিল না।‘’এই পরিবর্তনের সূত্রপাত অন্তত ২০ কোটি বছর আগে। মায়োসিন যুগে, অর্থাৎ প্রায় ২৩ থেকে ৫ মিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবীর প্রাণীকুল আজকের মতো হতে শুরু করেছে। এই সময়েই বিভিন্ন নতুন প্রাণীর উদ্ভব ঘটে। একই সময়ে, আফ্রিকার এপরা ধীরে ধীরে অন্য প্রজাতি থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। প্রায় ২.৫-৩ কোটি বছর আগে, আমাদের পূর্বপুরুষরা লেজওয়ালা বানরদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে অনেক লেজবিহীন এপের আবির্ভাব ঘটে। জীবাশ্মর সাক্ষ্য প্রমাণ এই পরিবর্তনের আভাস দেয়। কেনিয়ায় প্রায় ১৭–২০ মিলিয়ন বছর আগের এক প্রাচীন প্রজাতি একেম্বোর জীবাশ্ম দেখায়, সে সময়ের এপদের শরীরে লেজের প্রয়োজনীয় গঠন ছিল না। বিশেষ করে তাদের মেরুদণ্ডের নীচের ত্রিকাস্থি বা ‘স্যাক্রাম’ অংশটি লেজ বহন করার উপযোগী ছিল না। নাচোলাপিথেকাস নামের আরেকটি প্রজাতিরও একই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। অর্থাৎ সেই সময়ের মধ্যেই এপদের লেজ হারিয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের উত্তরসূরি হিসেবে মানুষও লেজবিহীন হয়েছে। প্রশ্ন হল, লেজ হারানোর কারণ কী? এর পেছনে বিভিন্ন তত্ত্ব রয়েছে। তবে মূল কারণ হিসেবে চলাফেরার ধরনকেই ধরা হয়। আধুনিক অনেক প্রাণী দ্রুত দৌড়ানো বা লাফানোর সময় ভারসাম্য রাখতে লেজ ব্যবহার করে। যেমন চিতা বা বানর। কিন্তু প্রাচীন এপরা তেমন দ্রুতগতির ছিল না। তারা গাছে ধীরে ধীরে চলাফেরা করত এবং ফল খেত। ডালের ওপর ভারসাম্য রেখে সাবধানে এগোতে হতো, যাতে পড়ে না যায়। এই ধরনের ধীর ও সতর্ক চলাফেরায় লেজের বিশেষ কোনো সুবিধা ছিল না। বরং লেজ বাড়ানো শরীরের জন্য অতিরিক্ত শক্তির অপচয় হতে পারে। এমনকি শিকারির কাছে ধরা পড়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই ধীরে ধীরে লেজ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং বিবর্তনের ধারায় তা হারিয়ে যায়। আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা ও চলাফেরার ধরনই নির্ধারণ করেছে যে আমরা লেজবিহীন।

 

সূত্র: Popular Science; April 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × five =