মায়ানমারের মহাভূমিকম্প

মায়ানমারের মহাভূমিকম্প

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ আগষ্ট, ২০২৫

২০২৫ সালের ২৮ মার্চ ভোরে মায়ানমার কেঁপে উঠেছিল এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে রিখটার স্কেলে ৭.৭ মাত্রার কম্পন হাজারো জীবন কেড়ে নেয়, ভেঙে দেয় শহর ও গ্রাম, অচল করে দেয় সেতু, রেললাইন আর বিদ্যুতের সংযোগ জাল। ভূমিকম্পটি ঘটেছিল সাগাইং চ্যুতি বরাবর—যা দেশজুড়ে উত্তর-দক্ষিণমুখী এক বিশাল চ্যুতিরেখা। ১৮৩৯ সালের পর থেকে এখানে কোনও বড় ভূমিকম্প ঘটেনি। বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন প্রায় ৩০০ কিলোমিটার অংশ ফেটে যাবে, কিন্তু পরে দেখা গেল চ্যুতি বা ফাটলটি হঠাৎ করেই ৫০০ কিলোমিটার জুড়ে সরে গেছে। এর মানে, পৃথিবীর অভ্যন্তরে জমে থাকা শক্তি শুধু ঘাটতি পূরণ করেনি, বরং অতিরিক্ত হিসাবেও একসাথে বেরিয়ে এসেছে।
ক্যালটেকের গবেষকরা উপগ্রহ চিত্র ব্যবহার করে এই রহস্য উন্মোচন করেন। সোলেন অঁতোয়ান নামের এক তরুণ গবেষক বিশেষ “ইমেজ কোরিলেশন টেকনিক” প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর চ্যুতির পূর্বদিক হঠাৎ করে প্রায় ৩ মিটার দক্ষিণে সরে গেছে পশ্চিম অংশের তুলনায়। সাধারণ রেডার প্রযুক্তি দিয়ে যা ধরা সম্ভব ছিল না, সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোই এবার ধরা পড়েছে নতুন প্রযুক্তির চোখে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—এমন ঘটনা কি অন্যত্রও ঘটতে পারে? বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রেয়াস ফল্টে, যা বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও বিপজ্জনক ফল্ট সিস্টেমগুলোর একটি। সাগাইং ও সান আন্দ্রেয়াস দুটোই দীর্ঘ-সরল স্ট্রাইক-স্লিপ চ্যুতি , যেখানে ভূ-পৃষ্ঠের দুই দিক বিপরীত দিকে সরে যায়। এদের বৈশিষ্ট্যে এতটাই মিল যে মায়ানমারের ঘটনার ছায়া ক্যালিফোর্নিয়ার ওপরও পড়তে শুরু করেছে।
ভূমিকম্পবিজ্ঞানে একটি প্রচলিত ধারণা হলো সিসমিক গ্যাপ হাইপোথিসিস। অর্থাৎ, যে অংশে বহু বছর ধরে কোনো বড় কম্পন হয়নি, সেখানেই পরবর্তী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। মায়ানমারের ক্ষেত্রেও এমনটাই অনুমান ছিল, কিন্তু বাস্তবে ভূমিকম্পটি প্রত্যাশার সীমা ভেঙে আরও বড় অংশ কাঁপিয়ে দেয়। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ভূমিকম্প শুধু অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, নতুন চমকও বয়ে আনতে পারে।

বর্তমানের মডেলগুলো কেবল পরিসংখ্যান নির্ভর। যেমন, একটি অঞ্চলে আগামী ৩০ বছরে নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প ঘটার সম্ভাবনা কত শতাংশ? কিন্তু এভাবে কেবল সম্ভাবনা জানা যায়, সময় নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। গবেষক জঁ-ফিলিপ অ্যাভুয়াকের মতে, ভবিষ্যতের নির্ভুল পূর্বাভাসের জন্য দরকার পদার্থবিদ্যার নিয়ম মেনে তৈরি মডেল। যেখানে শেষবার ফল্ট কবে, কতটা, কোথায় নড়েছে, তাকে হিসাবের মধ্যে রাখা হবে।
মায়ানমারের ভূমিকম্প তাই শুধু এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, একটি সতর্কবার্তাও বটে। এটি দেখিয়ে দিল, পৃথিবীর ভেতরের শক্তি অনেক সময় মানুষের অনুমানের সীমা ছাড়িয়ে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে তাই এখনই সতর্কতা, প্রস্তুতি এবং উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি।

সূত্র: “The 2025 Mw7.7 Mandalay, Myanmar, earthquake reveals a complex earthquake cycle with clustering and variable segmentation on the Sagaing Fault” by Solene L. Antoine, Rajani Shrestha, et.al; (11.8.2025), Proceedings of the National Academy of Sciences.
DOI: 10.1073/pnas.2514378122

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + eleven =