মার্গারেট বারব্রিজ : “নারী” বিজ্ঞানী নন, প্রকৃত বিজ্ঞানী 

মার্গারেট বারব্রিজ : “নারী” বিজ্ঞানী নন, প্রকৃত বিজ্ঞানী 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

১৯৫৫ সাল। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দির, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী টেলিস্কোপের ঠিকানা। জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্গারেট বারব্রিজ সেখানে পৌঁছেছিলেন একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে : যে কাজের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সেটাই করবেন। কিন্তু প্রথম দিনেই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হল। কারণটা বৈজ্ঞানিক নয়, প্রশাসনিকও নয়। কারণ তিনি একজন নারী। মাউন্ট উইলসনে তখন নারীদের পর্যবেক্ষণ করার অনুমতি ছিল না। এই একটি নিয়মই যথেষ্ট ছিল তাঁকে টেলিস্কোপ থেকে দূরে রাখার জন্য। এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বৈষম্যের গল্প নয়। এটি বিংশ শতকের বিজ্ঞান জগতের কাঠামোগত লিঙ্গরাজনীতির এক নগ্ন উদাহরণ। অথচ এই নারীই পরবর্তী সময়ে বদলে দিয়েছিলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণার ভিত্তি। আমরা কোথা থেকে এলাম, কী দিয়ে তৈরি, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পথ খুঁজেছিলেন। ১৯১৯ সালে ইংল্যান্ডের ড্যাভেনপোর্টে জন্ম মার্গারেটের (তখন নাম ছিল এলিনর মার্গারেট পিচি)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের সময় তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ছেন। চারপাশে যখন বেঁচে থাকার লড়াই, তখন তাঁর কৌতূহল ছিল একেবারেই অন্য দিকে। তারারা আসলে কী দিয়ে তৈরি? আকাশের রোমান্টিক সৌন্দর্য নয়, তিনি খুঁজছিলেন তার ভৌত সত্য। ১৯৪৮ সালে তাঁর বিয়ে হয় তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জিওফ্রি বারব্রিজের সঙ্গে। দু’জনের কৌতূহল একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করল। কিন্তু কৌতূহল থাকলেই তো আর মানমন্দিরের দরজা খোলে না। মার্গারেট যখন মাউন্ট উইলসনে কার্নেগি ফেলোশিপের জন্য আবেদন করলেন। সেটি সরাসরি বাতিল হয়ে গেল। কারণ আগেই বলেছি। কিন্তু তাঁরা হার মানেননি। এক ধরনের বৈজ্ঞানিক ‘কৌশল’ করা হল। জিওফ্রি ফেলোশিপের জন্য আবেদন করলেন এবং অনুমতি পেলেন। মার্গারেট পাশের ক্যালটেকে একটি পদ নিলেন। পর্যবেক্ষণের সময়, কাগজে-কলমে জিওফ্রির সহকারী হিসেবে মার্গারেট মানমন্দিরে ঢুকতেন। বাস্তবে কাজটা করতেন তিনিই। জিওফ্রি থাকতেন ডার্করুমে, মার্গারেট টেলিস্কোপ চালাতেন, পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতেন। কর্তৃপক্ষ বিষয়টা বুঝতে পেরেও তাঁকে বের করে দেয়নি। তবে শর্ত জুড়ে দিল : দম্পতিকে থাকতে হবে আলাদা কটেজে। পুরুষদের ডরমিটরি থেকে দূরে। কাজ করতে পারবেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ‘স্বাভাবিক’ পরিসরের বাইরে থেকে। মার্গারেট অভিযোগ করেননি। আসলে এক্ষেত্রে দরকার ছিল ধৈর্য, নির্ভুলতা, আর আলোর ক্ষুদ্র সংকেত শোনার ক্ষমতা। মাউন্ট উইলসনে তিনি এমন আলো সংগ্রহ করছিলেন, যা লক্ষ লক্ষ বছর আগে কোনও নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেই আলোয় লুকিয়ে ছিল সূক্ষ্ম স্পেকট্রাল (বর্ণালী) রেখা। সেটাই রাসায়নিক স্বাক্ষর, যা জানায় নক্ষত্রের ভেতরে কী ঘটছে। জিওফ্রি বারব্রিজ, উইলিয়াম ফাউলার ও ফ্রেড হয়েলের সঙ্গে তিনি বছরের পর বছর এই স্বাক্ষরগুলিকে মিলিয়েছেন নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার সঙ্গে। কাজটা ছিল একঘেয়ে, ধীর, নাটকীয়তাহীন। ফটোগ্রাফিক প্লেট, রাসায়নিক দাগ, ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা। কিন্তু প্রমাণ জমতে জমতে এক সময় হল বিস্ফোরণ। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হল এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ-“The Synthesis of the Elements in Stars”। সিদ্ধান্ত ছিল বৈপ্লবিক। মহাবিশ্বের মৌলগুলো আদিতে তৈরি হয়ে পড়ে ছিল না। তারা জন্মেছে নক্ষত্রের ভেতরে। কার্বন, অক্সিজেন, লোহা, ক্যালসিয়াম, জীবনের ভিত্তি, সবই তৈরি হয়েছে তারার অন্তঃস্থ চুল্লিতে, পৃথিবীর জন্মের বহু বহু আগে। এই কাজটি পরিচিত হল B²FH নামে। এটি আমাদের অস্তিত্বকে সরাসরি নক্ষত্রের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে বেঁধে দিল। ১৯৮৩ সালে এই কাজের জন্য নোবেল পেলেন উইলিয়াম ফাউলার। মার্গারেট বারব্রিজ পেলেন না। এর কোনও সরকারি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফাউলার নিজেই পরে এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মার্গারেট প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির মোহ ত্যাগ করেছেন। ১৯৭১ সালে আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি তাঁকে শুধু নারীদের জন্য সংরক্ষিত অ্যানি জাম্প ক্যানন পুরস্কার দিতে চাইলে, তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। মেয়েদের জন্য আলাদা পুরস্কারকে তিনি অগ্রগতি নয়, বৈষম্যের আরেক রূপ বলেই দেখেছিলেন। এই প্রত্যাখ্যান বিজ্ঞান জগতকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। সেখান থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে লিঙ্গবৈষম্য মোকাবিলার সংগঠিত উদ্যোগ শুরু হয়। মার্গারেট প্রতীক চাননি। তিনি চেয়েছিলেন সমান মাঠ, জবাবদিহি, প্রবেশাধিকার। পরবর্তী কালে তিনি হন রয়্যাল গ্রিনিচ মানমন্দিরের প্রথম নারী পরিচালক, আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির প্রথম নারী সভাপতি। এগুলো ছিল বহু দশকের কাজের স্বীকৃতি। মার্গারেট বারব্রিজের উত্তরাধিকার শুধু একখানা প্রবন্ধ কিংবা ‘প্রথম নারী’ তকমায় আটকে নেই। তাঁর জীবন থেকে বেরিয়ে আসে এক মৌলিক সত্য। মহাবিশ্ব বৈষম্য করে না। প্রশ্ন করে না আপনি কে? সীমানা তৈরি করে মানুষই। আর যখন প্রমাণ যথেষ্ট শক্ত, জেদ যখন দীর্ঘস্থায়ী, তখন সেই সীমানা একসময় ভেঙেই পড়ে। তিনি অনুমতির অপেক্ষা করেননি, কাজ করেছেন। আর সেই কাজের মাধ্যমেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষের শরীরের প্রতিটি পরমাণুর শিকড় কোথায়- নক্ষত্রে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + 3 =