মেঘের বুক চিরে নেমে আসা আলোর তীব্র ঝলকানি অর্থাৎ বজ্রপাত প্রকৃতির এক ভয়ংকর শক্তি। এর প্রচণ্ড তাপ ও বৈদ্যুতিক শক্তি মুহূর্তের মধ্যে গাছপালা ধ্বংস করতে পারে, আগুন লাগাতে পারে, প্রাণহানির কারণও হতে পারে। কিন্তু এই ধ্বংসাত্মক ঘটনার এক বিস্ময়কর সৃজনশীল দিকও আছে। সাম্প্রতিক অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বজ্রপাত মাটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে এমনভাবে বদলে দিতে পারে, যা মাশরুম ও অন্যান্য ছত্রাকের দ্রুত বিস্তারের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করে। কী করে?
বজ্রপাতের পথ ধরে তাপমাত্রা প্রায় ৩০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই প্রচণ্ড তাপ মাটির উপরের স্তরে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীবকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে মাটিতে পুষ্টি ও বাসস্থানের জন্য যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল, তা হঠাৎ করেই কমে যায়। অন্যদিকে, ছত্রাকের স্পোর বা বীজগুটিগুলো তাদের শক্ত কাইটিন-সমৃদ্ধ আবরণে সুরক্ষিত থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই টিকে যায়। প্রতিযোগী জীবের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই সময় ছত্রাকের ভূ-গর্ভস্থ জালিকা/ মাইসেলিয়াম দ্রুত বিস্তার লাভের সুযোগ পায়।
তবে বজ্রপাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত মাটির পুষ্টি বৃদ্ধি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রচুর নাইট্রোজেন থাকলেও অধিকাংশ জীব সরাসরি তা ব্যবহার করতে পারে না। বজ্রপাতের তীব্র শক্তি এই নিষ্ক্রিয় নাইট্রোজেনকে নাইট্রেট ও অন্যান্য সক্রিয় যৌগে রূপান্তরিত করে। পরবর্তীতে বৃষ্টির জলের মাধ্যমে এসব যৌগ মাটিতে মিশে যায় এবং মাটিকে নাইট্রোজেনে সমৃদ্ধ করে তোলে।ছত্রাকের বৃদ্ধি, প্রোটিন উৎপাদন এবং কোষ গঠনের জন্য নাইট্রোজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। তাই বজ্রপাতের পর তৈরি হওয়া এই পুষ্টিসমৃদ্ধ পরিবেশ তাদের দ্রুত বিকাশে সহায়তা করে।
একই সঙ্গে বাজের বৈদ্যুতিক শক্তি মাটিতে থাকা জটিল জৈব পদার্থকে ভেঙে সহজলভ্য খনিজ, শর্করা ও অন্যান্য পুষ্টিতে পরিণত করে। ছত্রাক সহজেই এসব উপাদান শোষণ করতে পারে। বজ্রপাতের অভিঘাতে মাটিতে সূক্ষ্ম ফাটলও সৃষ্টি হয়, যা অক্সিজেন প্রবাহ বাড়ায় এবং ছত্রাকের শ্বাস-প্রশ্বাসকে আরও কার্যকর করে তোলে।
বজ্রপাতের পরপরই যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন তা মাটিকে আর্দ্র রাখে। তখন যেন প্রকৃতির সব শর্ত একসঙ্গে পূরণ হয়ে যায়। বহুদিন ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা বীজাণুগুলো দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাটির বুক ভেদ করে বেরিয়ে আসে অসংখ্য মাশরুম। বিশেষ করে মোরেল ও কিছু ব্যাসিডিওমাইসেট প্রজাতির ছত্রাকসহ কিছু ছত্রাক প্রজাতি বজ্রপাত-পরবর্তী এই পরিবেশেই বেশ খানিকটা দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি পায়।
প্রকৃতিতে ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্যেকার সম্পর্ক যথেষ্ট গভীর। বজ্রপাত একদিকে ক্ষতি করলেও অন্যদিকে মাটির পরিবেশকে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করে, যা ছত্রাকের পুনর্জন্ম এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রের নবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সূত্র: Science Acumen
