মৃৎশিল্পে প্রাগৈতিহাসিক গণিতবোধ 

মৃৎশিল্পে প্রাগৈতিহাসিক গণিতবোধ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ জানুয়ারী, ২০২৬

সংখ্যা আবিষ্কারের বহু আগেই মানুষ যে গণিত বুঝত, তারই এক অভূতপূর্ব প্রমাণ উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন শিল্প থেকে। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর মেসোপটেমিয়ার হালাফিয়ান সংস্কৃতির মানুষরা প্রায় আট হাজার বছর আগে ফুলের নকশার মাধ্যমে জ্যামিতি ও সংখ্যাগত চিন্তার চর্চা করতেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২০০ থেকে ৫৫০০ সালের মধ্যে বিকশিত এই কৃষিভিত্তিক সমাজের মৃৎপাত্রে ফুল, গাছ, ডালপালা ও ঝোপঝাড়ের চিত্র আঁকা হতো অত্যন্ত সুনিয়মিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সুষম বিন্যাসে। এসব নকশার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল এই যে, ফুলের পাপড়ি ও মোট ফুলের সংখ্যায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে গাণিতিক ধারার ব্যবহার। অনেক পাত্রে দেখা যায় ৪, ৮, ১৬, ৩২ কিংবা ৬৪ পাপড়ি বা ফুলের বিন্যাস, যা নিছক কল্পনাপ্রসূত অলংকরণ নয়, সচেতন পরিকল্পনার ফল।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিশ্লেষণ করে গবেষক প্রফেসর ইয়োসেফ গারফিনকেল ও সারা ক্রুলউইচ দেখিয়েছেন, হালাফিয়ান শিল্পই মানব ইতিহাসে প্রথম ধারাবাহিক উদ্ভিদচিত্রণের উদাহরণ। এর আগে প্রাগৈতিহাসিক শিল্পে মূলত মানুষ ও প্রাণীর উপস্থিতিই বেশি ছিল। এই পরিবর্তন একটি গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ইঙ্গিতবাহী। যেখানে মানুষ প্রকৃতিকে শুধু ব্যবহার্য সম্পদ নয়, সৌন্দর্য ও নান্দনিক চিন্তার উৎস হিসেবে দেখতে শুরু করে।

গবেষকদের মতে, এই শিল্পের পেছনে থাকা গণিতচিন্তা ছিল বাস্তব জীবনের প্রয়োজন থেকে উৎসারিত। জমি ভাগ করা, ফসল সমানভাবে বণ্টন করা বা বসতির মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো কাজে স্থান ও সংখ্যার ধারণা জরুরি ছিল। লিখিত সংখ্যাপদ্ধতি না থাকলেও মানুষ শিল্পের মাধ্যমে এই বোধকে দৃশ্যমান করে তুলেছিল।

এই গবেষণা এথনোম্যাথমেটিক্স, অর্থাৎ বিশেষ জনজাতি কেন্দ্রিক গণিতবিদ্যার ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এ ধরনের গনিত কোনো নির্দিষ্ট সূত্র বা নিয়ম মেনে চলে না । এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কৃতি, সমাজ ও জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন, শিল্পকলা, কারুশিল্প, ভাষা ও ঐতিহ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গাণিতিক বোধকে বিশ্লেষণ করা হয়। সেই জন্যই, এসব চিত্রে কোনো খাদ্যশস্যের ছবি নেই, বরং ফুলই প্রাধান্য পেয়েছে। গবেষকদের মতে, ফুল মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আবেগ জাগায়, সেকারণেই এটি তাদের শিল্পের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিল।

এই গবেষণা গণিতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে। দেখিয়েছে, গণিত কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়; বরং তা মানব সমাজের গভীরে প্রোথিত শিল্প, সৌন্দর্যবোধ ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। প্রাচীন হালাফিয়ান মৃৎপাত্রের ফুলগুলো তাই শুধু অলংকরণ নয়—সেগুলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির সুস্পষ্ট ভাষা।

 

সূত্র: “The Earliest Vegetal Motifs in Prehistoric Art: Painted Halafian Pottery of Mesopotamia and Prehistoric Mathematical Thinking” by Yosef Garfinkel, and Sarah Krulwich, 5th December 2025, Journal of World Prehistory.

DOI: 10.1007/s10963-025-09200-9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × three =