
হাঙর অনেক বছর ধরে মানুষকে বিস্মিত করে আসছে। এর বিশাল দাঁত ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কঙ্কালের ধ্বংসাবশেষ দেখেই মনে হয়েছিল এটি মোটা ও শক্তিশালী একটি প্রাণী। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পূর্বে যা ধারণা করা গিয়েছিল তার চেয়েও লম্বা ও খানিকটা সরু, গ্রেট হোয়াইট হাঙরের মতো ছোটখাটো নয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট প্রাপক ফিলিপ স্টার্নস বর্তমানে হাঙর সংরক্ষণের কাজ করছেন ও মেগালোডন নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আনতে সাহায্য করেছেন।তিনি ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষক দল মেগালোডনের মেরুদন্ড পরীক্ষা করে তার আকৃতি এবং সাঁতারের ধরন সম্পর্কে জানতে ১০০ টিরও বেশি আধুনিক ও প্রাচীন হাঙর প্রজাতির সাথে তার তুলনা করেছেন। গবেষকরা মেগালোডনের আকার বুঝতে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আগে শুধু দাঁতের আকার দেখে ধারণা করা হতো, কিন্তু এবার তারা পুরো শরীরকে ভাগ করে আলাদা আলাদা খণ্ডে পরিমাপ করেছেন। এর থেকে জানা গেছে মেগালোডন প্রায় ৮০ ফুট লম্বা । এর ওজন প্রায় ৯৪ টন, যা একটি বড় তিমির ওজনের মতো। তবে, এটির আকার মোটা বা ছোট হওয়ার পরিবর্তে লম্বা ও সরু ছিল। যার ফলে এরা জলের মধ্যে দ্রুত সাঁতার কাটতে পারত।এদের পাতলা শুঁড় ও
সরু,মসৃণ শরীরের আকার কম শক্তি খরচ করে দূর-দূরান্তে সাঁতার কাটতে সাহায্য করত। গবেষকরা বলছেন, এই গবেষণায় মেগালোডনের আকার ও গঠন নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে।বিজ্ঞানী টিম হাইয়ামের মতে, সাঁতারের সময় পেটের বদলে মাথা সামনে থাকলে বেশি সুবিধা হয়।এ কারণে লম্বা ও সরু শরীর জলের বাধা কমিয়ে দক্ষ সাঁতারুদের মতো সহজে এগিয়ে যেতে পারে। গবেষক হাইয়াম আরও বলেন, বিশালকায় শিকারীদের শরীর কতটা মোটা বা লম্বা হবে, তা প্রকৃতির নিয়ম ঠিক করে দেয়। বড় সমুদ্রের শিকারীরা সাধারণত দ্রুত আক্রমণ করে, তারপর ধীরে সাঁতার কাটে।মেগালোডনের শরীরের গঠনও এমনই ছিল। এটি মাঝারি গতিতে সহজে জলে সাঁতার কাটতে কাটতে শিকার ধরার সময় গতি বাড়িয়ে দিত।গ্রেট হোয়াইট হাঙর খুব দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে তিমির মতো দক্ষ নয়। গবেষক স্টার্নস বলেন, মেগালোডনের বাচ্চারা জন্মের পরই ছোট সামুদ্রিক প্রাণীদের শিকার করতে পারত। গবেষণায় দেখা গেছে, মেগালোডনের বাচ্চাদের জন্মের সময়ই দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ ফুট হতো, যা একটা বড় গ্রেট হোয়াইট হাঙরের সমান। এত বড় হওয়ায় তারা ছোট শিকার ধরতে সহজেই সক্ষম ছিল। আধুনিক লেমন হাঙর ধীরে সাঁতার কাটলেও শিকার ধরার সময় হঠাৎ গতি বাড়াতে পারে।গবেষকরা দেখেছেন, মেগালোডনের মেরুদন্ডের গঠন লেমন হাঙরের মতোই । এতে মনে হয়, এটি তিমির মতো বিশাল হলেও শরীর ছিল সাঁতারের জন্য উপযুক্ত।আগে মনে করা হতো মেগালোডন গ্রেট হোয়াইট হাঙরেরই বড় সংস্করণ, কিন্তু নতুন গবেষণা অনুযায়ী , এটি আসলে আরও লম্বা ও ছিপছিপে ছিল। বড় মাছের ক্ষেত্রে শুধু আকার নয়, শরীরের গঠনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শরীর খুব মোটা হলে জলে ঘোরাফেরায় কষ্ট হয়, কিন্তু লম্বা ও সরু হলে সহজে এগিয়ে যাওয়া যায়।তিমি হাঙর ও বাস্কিং হাঙর বিশাল হলেও জলে মসৃণভাবে ঘোরাফেরা করতে পারে। বড় হাঙরদের জীবাশ্ম খুব কম পাওয়া যায়। এর থেকে বোঝা যায় যে তারা বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ পরিবেশের ওপর নির্ভর করত।কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন ও গ্রেট হোয়াইটের মতো শক্তিশালী শিকারীদের প্রতিযোগিতা মেগালোডনের জন্য সমস্যা তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এই কারণগুলো একত্রে মেগালোডনকে বিলুপ্ত করে দেয়। মেগালোডন সম্পর্কে নতুন গবেষণা সমুদ্রের বড় প্রাণীদের গঠনের নিয়মগুলো বুঝতে সাহায্য করে। বড় প্রাণীদের, যেমন হাঙর বা তিমি, সাধারণত একই ধরনের শরীরের গঠন হয়। তাদের গতি ও শক্তি ভিন্ন হলেও, সবাই এমনভাবে তৈরি হয় যাতে জলের বাধা কম লাগে এবং সহজে সাঁতার কাটতে পারে। এই গঠন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অনেক প্রাণীর মধ্যে দেখা গেছে।এই গবেষণা প্যালিওন্টোলজিয়া ইলেকট্রনিকা নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।