ম্যাক্সওয়েলের অদৃশ্য আলো

ম্যাক্সওয়েলের অদৃশ্য আলো

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৯ জানুয়ারী, ২০২৬

১৮৬৫ সাল। খবর পৌঁছাত তামার তারে, ট্রেনের লাইনে, কিংবা সমুদ্রের তলায় পাতা কেব্‌লের ভিতর দিয়ে। তার ছিঁড়লেই যোগাযোগ শেষ। কোনো তার ছাড়াই, শূন্যের ভিতর দিয়ে তথ্য চলতে পারে, এমন ভাবনা তখন প্রায় কল্পবিজ্ঞান। ইঞ্জিনিয়ারিং মানে ছিল ধাতু, শব্দ, চোখে দেখা বস্তু আর হাতে ধরার যন্ত্র।

ঠিক এসময়ই শিল্পবিপ্লবের কালে এক স্কটিশ গণিতবিদ সম্পূর্ণ অন্য পথের সন্ধান করলেন। তিনি জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (১৮৩১-১৮৭৯)। তাঁর জন্ম এডিনবরায়, মৃত্যু কেমব্রিজে। যন্ত্র নয়, ইঞ্জিন নয়, তাঁর আগ্রহ ছিল অদৃশ্য শক্তিতে। তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করছিলেন মাইকেল ফ্যারাডে (১৭৯১-১৮৬৭)-র কাজের বিবরণ। ফ্যারাডে পরীক্ষা সহযোগে দেখিয়েছিলেন, বিদ্যুৎ আর চৌম্বক ক্রিয়া একে অপরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কিন্তু ফ্যারাডে ছিলেন পরীক্ষাসিদ্ধ বিজ্ঞানী, তিনি যথেষ্ট গণিত জানতেন না। তিনি “ক্ষেত্র”-র কথা বলতেন, শূন্যস্থান ভরে থাকা শক্তির জালের কথা বলতেন, কিন্তু তার গাণিতিক সমীকরণ বার করতে পারেননি। তখন অনেকের কাছেই এসব ছিল নিছক অবাস্তব কল্পনা।

গণিতজ্ঞ ম্যাক্সওয়েল কিন্তু বুঝেছিলেন, ফ্যারাডের কল্পনা আসলে বাস্তবের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ফ্যারাডের অন্তর্দৃষ্টিকে গণিতের ভাষায় অনুবাদ করার ব্রত নিলেন। ১৮৬৫ সালে প্রকাশ করলেন এক যুগান্তকারী প্রবন্ধ। দেখালেন, কীভাবে বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্র একে অপরের জন্ম দেয় এবং শূন্যের ভিতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সমীকরণগুলি ছিল জটিল, সমসাময়িক বহু পদার্থবিদের বোধগম্যতার বাইরে। কিন্তু তার ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক যুগান্তকারী সত্য।

ম্যাক্সওয়েল হিসাব করে দেখলেন, এই ক্ষেত্রগুলির তরঙ্গগতির মান ঠিক আলোর গতির সমান। সুতরাং অবধারিত সিদ্ধান্ত হল, আলো নিজেই এক তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ। এমন অসংখ্য তরঙ্গ আছে, যেগুলি আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু তারা বাস্তবে আছে। জগদীশচন্দ্র বসুর ভাষায়, এরা হল ‘অদৃশ্য আলোক ‘।

তখনকার বিজ্ঞানীরা দ্বিধায় পড়লেন। তত্ত্ব তো নিখুঁত, কিন্তু প্রমাণ কই? ম্যাক্সওয়েল পড়তেন, লিখতেন, ভাবতেন। কিন্তু তাঁর চোখের সামনে কোনো যন্ত্র এই তরঙ্গ ধরতে পারেনি। ১৮৭৯ সালে, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে, ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হল। তিনি রেখে গেলেন কিছু সমীকরণ, যা বাস্তবতার এক অদেখা কাঠামোর কথা বলে, যাকে তখনও কেউ বাস্তবে চাক্ষুষ করতে পারেনি।

 

ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যুর আট বছর পর দৃশ্যপট বদলাল। জার্মানির হাইনরিশ হার্টজ (১৮৫৭-১৮৯৪) পরীক্ষা করে দেখিয়ে দিলেন, ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব ঠিক। বাস্তবে তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ তৈরি করা যায়, তার দৈর্ঘ্য মাপা যায়। এই একটিমাত্র প্রমাণ থেকেই শুরু হল প্রযুক্তির একের পর এক অগ্রগতি। ক্রমে রেডিও তরঙ্গ, মাইক্রোওয়েভ, এক্স-রে এসব তড়িৎ-চৌম্বক বর্ণালির পরিচয় পাওয়া গেল জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের খাঁটি গাণিতিক সমীকরণ থেকে। হার্টজ-এর কাজের ভিত্তিতে অলিভার লজ, জগদীশচন্দ্র বসু, আলেকজান্ডার পপভ প্রমুখ বিজ্ঞানী দুনিয়া জুড়ে গবেষণা চালালেন। একে একে তৈরি হল রেডিও, রেডার, টেলিভিশন, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক প্রভৃতি প্রযুক্তি। সবকিছুর শিকড় গিয়ে ঠেকে ম্যাক্সওয়েলের ওই কটি অবিস্মরণীয় সমীকরণে।

আজ আমরা যখন মোবাইল ফোনে কথা বলি, ওয়াইফাইয়ে ডেটা পাঠাই, জিপিএস দিয়ে পথ খুঁজি, প্রতিটি সংকেতের পিছনে কাজ করে উনিশ শতকের সেই গণিত। ভিক্টোরিয় যুগের স্কটল্যান্ডে ম্যাক্সওয়েলের সেই সব হাতে লেখা সমীকরণই আজকের দিনের তথ্যযুগের ইঞ্জিন। নিউটনের গতিসূত্র আর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার পাশে ম্যাক্সওয়েলের কাজ তাই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের স্তম্ভ।

ম্যাক্সওয়েল কোনো যন্ত্র বানাননি। কোনো তার পাতেননি। তিনি কখনও রেডিও শোনেননি, ওয়্যারলেস সংকেত দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন ব্রহ্মাণ্ডের ভিতর লুকিয়ে থাকা নিয়ম। তিনি ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন। শূন্যের ভিতর দিয়ে আজ যে তথ্য ছুটে চলে, যা ছাড়া দুনিয়া অচল, তার স্থপতি ছিলেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × one =