দিনের আলো আমাদের শরীরকে সমৃদ্ধ করে। আর রাতের অন্ধকার তাকে বিশ্রামের সংকেত দেয়। কিন্তু আজকের আধুনিক নগরজীবনে সেই স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হতে হতে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। ঘুমের ঘরে জ্বলে থাকা আলো, জানালার বাইরে রাস্তার বাতি, টেলিভিশন কিংবা মোবাইলের পর্দা, অর্থাৎ রাতকে আমরা যত বেশি আলোকিত করছি, শরীর হয়তো ততটাই হারিয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় অন্ধকার। সম্প্রতি এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেল, এই পরিবর্তনের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতার একটি যোগসূত্র আছে। ইউরোপীয়ান হার্ট জার্নালে এই গবেষণাটির বিবরণ বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণায় ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাতে তুলনামূলক বেশি আলোর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের হৃদ্যন্ত্রে এমন কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্চাপ বাড়ায়। গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্সের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লু কিউ।
গবেষণায় ইউ কে বায়ো ব্যাংক-এর ১১,০৭১ জন অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রত্যেকে টানা সাত দিন কবজিতে একটি আলোক-সেন্সর পরে ছিলেন, যার মাধ্যমে রাতে তাঁদের চারপাশের আলোর মাত্রা নথিবদ্ধ করা হয়। তিন বছর পর তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করা হয় কার্ডিয়াক এম আর আই-এর মাধ্যমে। গবেষকেরা ৩ লাক্সের (আলোক বিকিরণের এস আই একক) বেশি রাতের আলোয় থাকা ব্যক্তিদের তুলনা করেন প্রায় অন্ধকার পরিবেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ।
তাতেই উঠে আসে আসল পার্থক্য। বেশি রাতের আলোয় থাকা ব্যক্তিদের বাম নিলয়ের গাত্র/ দেওয়াল মোটা হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে হৃদ্যন্ত্রের ওই প্রকোষ্ঠের ভেতরের কার্যকর স্থান কমে যেতে থাকে। একই সঙ্গে হৃদ্স্পন্দনের সময় হৃদ্পেশির স্বাভাবিক নমনীয়তা কমে যাওয়ার লক্ষণও পাওয়া যায়। এছাড়া, ডান নিলয় ও বাম অলিন্দেও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছে।
এই ঘটনাকে বলা হয় কার্ডিয়াক রিমডেলিং। দীর্ঘদিনের চাপ বা আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় হৃদ্যন্ত্র নিজের গঠন বদলে নিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। প্রথমে এটি অভিযোজনের কাজ করলেও দীর্ঘস্থায়ী হলে হৃদ্পেশি শক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।
এর আগে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় রাতের কৃত্রিম আলো এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। নতুন গবেষণাটি সেই সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে হৃদ্যন্ত্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে রাতের আলোর যোগসূত্র দেখিয়েছে। তবে এটি কেবল একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। তাই রাতের আলোই সরাসরি এই পরিবর্তনের কারণ, এমন সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া যায় না।
তথাপি এ গবেষণার বার্তা উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্রোগ প্রতিরোধের আলোচনায় রাতের আলোক-পরিবেশকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শোবার ঘর অন্ধকার রাখা, ঘুমের আগে স্ক্রিনের ব্যবহার কমানো, তীব্র সাদা আলোর পরিবর্তে কম উজ্জ্বল উষ্ণ রঙের আলো ব্যবহার করা এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষুদ্র এল ই ডি আলো ঢেকে রাখা, এই সহজ অভ্যাসগুলি সহায়ক হতে পারে।
বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত জীবনযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রমবর্ধমান আলোক দূষণ এখন নগরপরিবেশেরও একটি গুরুতর সমস্যা। তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে উজ্জ্বল স্ট্রিটলাইটের পরিবর্তে আলোকে নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করা, উষ্ণ-স্পেকট্রামের বাতি ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলো কমানো বা মোশান-সেন্সরযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রভৃতি পদক্ষেপও বিবেচনা করা যেতে পারে।
দিনের আলো যেমন জীবনের জন্য অপরিহার্য, তেমনই রাতের অন্ধকারও শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের অংশ। সত্যি বলতে হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখতে শুধু কী খাচ্ছি বা কতটা ব্যায়াম করছি তা নয়, রাতের চারপাশ কতটা অন্ধকার থাকছে, সেটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: Dai, J., et al. (2026) Nighttime light exposure and cardiac structure and function. European Heart Journal. DOI: 10.1093/eurheartj/ehag563. https://academic.oup.com/eurheartj/advance-article/doi/10.1093/eurheartj/ehag563/8770409
