আমাদের দেশে না হলেও, পশ্চিমের রান্নাঘরে থাইম এক সুপরিচিত সুগন্ধি ভেষজ। অনেকটা জোয়ানের মতো স্বাদ। এই থাইম মশলা ঢুকে পড়েছে মাইক্রোচিপ আর ন্যানোপ্রযুক্তির জগতে। বিজ্ঞানীরা এমন এক কৌশল আবিষ্কার করেছেন, যার মাধ্যমে থাইম নির্যাসকে অতি ক্ষুদ্র, নিখুঁত মাত্রায় বন্দি করা যায় অণুবীক্ষণিক ক্যাপসুলের ভেতরে। লক্ষ্য একটাই- ভেষজ যৌগকে আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। ওষুধ ও খাদ্যশিল্প, দু’দিকেই। থাইম নির্যাসকে বহুদিন ধরেই “প্রাকৃতিক শক্তিধর ওষুধ” বলা হয়। কারণ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একগুচ্ছ জৈব সক্রিয় যৌগ। যেমন, থাইমল, কারভাক্রল, রোজম্যারিনিক অ্যাসিড, ক্যাফেইক অ্যাসিড। এই যৌগগুলো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, প্রদাহ কমায়, জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ে এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে। কিন্তু যতই গুণসম্পন্ন হোক, থাইম এক্সট্র্যাক্টের একটা বড় সমস্যা হল, এটা সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ফলে এর সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি সঠিক মাত্রায় এর ব্যবহার করাও হয়ে পড়ে প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, বেশি পরিমাণে ব্যবহার করলে ত্বকে র্যাশ, পেটের অস্বস্তি প্রভৃতি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। এই দুই সমস্যারই সমাধান খুঁজে পেয়েছেন রাশিয়ার টমস্ক পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি এবং সুরগুট স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। তাঁরা থাইম নির্যাসকে ‘ন্যানোডোজ’-এ ভাগ করে অন্য এক তরলের ভেতরে ঢুকিয়ে দেন, যাতে এটা না উবে যায় বা শরীরকে বিরক্ত করে। এই পদ্ধতিটা শুনতে সহজ লাগলেও, এর পেছনে আছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তরল-নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি। গবেষকরা প্রথমে থাইম নির্যাসকে জেলাটিনের সঙ্গে মিশিয়ে একটি অতিক্ষুদ্র চিপের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করেন। একই সঙ্গে আরেকটি প্রবাহ হিসেবে পাঠানো হয় সোডিয়াম অ্যালজিনেট, যা খাদ্যশিল্পে বহুল ব্যবহৃত একটি ঘনকারক উপাদান। চিপের ভেতরে এই দুই তরল পাশাপাশি বয়ে যায়, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় না। ঠিক এই সময়ে, পাশ থেকে প্রবেশ করে তেলের একটি প্রবাহ, যা পুরো ব্যবস্থাটিকে ভেঙে দেয় অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটায়। প্রতিটি ফোঁটাই একেকটি সম্পূর্ণ সিল করা ন্যানোক্যাপসুল। ভেতরে থাকে নির্দিষ্ট মাত্রার থাইম নির্যাস। এখানে থাইমের কতটা ডোজ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা বড়ো কথা নয়। মুখ্য ফল হল, ন্যানোস্তরে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক ডোজ দেওয়া সম্ভব। ওষুধ তৈরির জগতে এ এক বিশাল অগ্রগতি। কারণ অনেক ওষুধই কার্যকর হয় নির্দিষ্ট মাত্রায়। একচুল এদিক-ওদিক হলেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেড়ে যায়। গবেষক ম্যাক্সিম পিসকুনভ বলেন, “এই সিস্টেমটা প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে প্রতিবার প্রায় একই ডোজ নিশ্চিত করা যায়, ড্রাগ ডেলিভারির জন্য যা অত্যন্ত মূল্যবান।“ তিনি আরও জানান, অতি ক্ষুদ্র ফোঁটারও আকার বদলানো সম্ভব। কিন্তু তার জন্য তেলের প্রবাহের গতি সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তবে এই প্রযুক্তি এখনও সরাসরি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। পরবর্তী ধাপে এই ন্যানোডোজগুলোকে এমনভাবে প্যাকেজ করতে হবে, যাতে তা খাওয়ার ক্যাপসুলে ব্যবহার করা যায়। তবে সম্ভাবনার দরজা ইতিমধ্যেই খুলে গেছে। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র থাইম নির্যাসের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য ভেষজ বা জলীয় নির্যাসেও এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে। এমনকি খাদ্যশিল্পেও, যেখানে স্বাদ, সুবাস বা পুষ্টিগুণ নিয়ন্ত্রিতভাবে যোগ করার দরকার পড়ে। পিসকুনভ আরও এক ধাপ এগিয়ে ভবিষ্যতের ছবি এঁকেছেন। “যদি এই সিস্টেমের সঙ্গে মেশানো যায় মেশিন ভিশন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাহলে বাস্তব ক্ষেত্রে ন্যানোডোজ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। আমরা ইতিমধ্যেই আরও উচ্চমাত্রার জৈব সক্রিয় উপাদানযুক্ত জল-অ্যালকোহল নির্যাস ক্যাপসুলে ভরার কাজ করছি,” তিনি বলেন। রান্নাঘরের ভেষজ থেকে ন্যানোস্কেলের ক্যাপসুল – থাইমের এই যাত্রা আসলে দেখিয়ে দেয়, আধুনিক বিজ্ঞান কীভাবে প্রাচীন প্রাকৃতিক উপাদানকে নতুন ভাষায়, নতুন ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনছে। আজ থাইম আর শুধু একটা মশলা নয়, এটা ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ ও স্মার্ট চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সূত্র: Mathematical model of nanodosing of water–thyme extract using droplet microfluidics. Physics of Fluids, 2026
