রাশিতাত্ত্বিক বলবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা জোসিয়া উইলার্ড গিবস 

রাশিতাত্ত্বিক বলবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা জোসিয়া উইলার্ড গিবস 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২১ আগষ্ট, ২০২৬

বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক ক্ষেত্রেই খ্যাতি ও অবদানের মধ্যে সব সময় সরল সমানুপাতিক সম্পর্ক থাকে না। কেউ কেউ জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন, আবার কেউ আড়ালে থেকেই এমন ধারণার জন্ম দেন, যার সুফল ভোগ করে পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্ম। জোসিয়া উইলার্ড গিবস ছিলেন দ্বিতীয় ধরনের বিজ্ঞানী। প্রচারের আলো থেকে দূরে, নিউ হ্যাভেনের প্রায় একই জায়গায় কেটেছিল তাঁর জীবন। আধুনিক তাপগতিবিদ্যা, ভৌত রসায়ন এবং রাশিতত্ত্ব ভিত্তিক বলবিদ্যার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

১৮৩৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেনে গিবসের জন্ম। বাবা ছিলেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মশাস্ত্রের অধ্যাপক। ১৮৬৩ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পি এইচ ডি অর্জন করেন। আমেরিকায় ওই বিষয়ে প্রথম পিএইচডি ডিগ্রিধারী তিনি। পরবর্তী কয়েক বছর প্যারিস, বার্লিন ও হাইডেলবার্গে পড়াশোনা ও গবেষণার পর ১৮৬৯ সালে নিউ হ্যাভেনে ফিরে আসেন। ১৮৭১ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে গাণিতিক পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিয়োগ করে। প্রথম নয় বছর তাঁর এই পদ ছিল অবৈতনিক। পারিবারিক সম্পত্তির আর্থিক নিরাপত্তা থাকায় তিনি এসব তুচ্ছ বিষয়কে উপেক্ষা করে গবেষণায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।

গিবসের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল রাসায়নিক তাপগতিবিদ্যার গাণিতিক ভিত্তি নির্মাণ। ১৮৭৬ ও ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত দুই-খণ্ডের গবেষণা পত্র On the Equilibrium of Heterogeneous Substances রাসায়নিক সাম্যাবস্থার আধুনিক ধারণাকে সুসংগঠিত করে। তিনি রাসায়নিক বিভব এবং মুক্ত শক্তির ধারণাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও রাসায়নিক বিক্রিয়া ও সাম্যাবস্থা বোঝার মূল ভিত্তি। তিনি ই ফেজ রুলের প্রবর্তক। তাপমাত্রা, চাপ ও ঘনত্ব প্রভৃতি কতগুলি স্বাধীন চলক পরিবর্তিত হলেও একটি সিস্টেমের মধ্যে উপস্থিত বিভিন্ন দশার সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে—তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে এই নিয়ম। গিবসের আরেক যুগান্তকারী অবদান ছিল রাশি তত্ব ভিত্তিক বলবিদ্যার গাণিতিক কাঠামো নির্মাণ। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল ও লুডভিগ বোল্টজমানের সঙ্গে তিনি দেখান, বিপুল সংখ্যক অণু-পরমাণুর সম্মিলিত আচরণ থেকেই কীভাবে তাপগতিবিদ্যার ম্যাক্রোস্কোপিক নিয়মগুলির রাশিতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তিনি একক কোনো ব্যবস্থার পরিবর্তে একই শর্তে ক্রিয়াশীল অসংখ্য সম্ভাব্য ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক রূপ কল্পনা করে তাদের গড় আচরণ বিশ্লেষণ করেন। ১৯০২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Elementary Principles in Statistical Mechanics’- গ্রন্থটি সাম্যাবস্থার রাশিতাত্ত্বিক বলবিদ্যার অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে ওঠে।

এর পাশাপাশি গিবস আধুনিক ভেক্টর ক্যালকুলাস-এর বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী অলিভার হেভিসাইডও প্রায় একই সময়ে স্বাধীনভাবে একই ধরনের পদ্ধতি বিকশিত করছিলেন।

১৯০৩ সালের ২৮ এপ্রিল নিউ হ্যাভেনে গিবসের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবন কাটে প্রায় সম্পূর্ণভাবে একটি শহর ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে।তাঁর কর্মজীবনও কেটেছে বেশ নিভৃতেই। জীবদ্দশায় তাঁর পরিচিতি তাঁর অবদানের তুলনায় সীমিত ছিল। কিন্তু যত সময় এগিয়েছে তাঁর কাজের প্রকৃত গুরুত্ব তত ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আজ গিবসের মুক্ত শক্তি রাসায়নিক সাম্যাবস্থা ও বিক্রিয়ার স্বতঃস্ফূর্ততা বোঝার অন্যতম প্রধান ধারণা। ফেজ রুল পদার্থের বিভিন্ন দশার সম্পর্ক বিশ্লেষণের মৌলিক হাতিয়ার। আর গিবসের রাশিমালা বিপুল সংখ্যক কণার সম্মিলিত আচরণ বোঝার জন্য রাশিতাত্ত্বিক বলবিদ্যার কেন্দ্রীয় ধারণাগুলির একটি।

গিবসের উত্তরাধিকার কোনো একক আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—অসংখ্য অদৃশ্য কণার পৃথক গতিবিধির বদলে তাদের সম্ভাব্য সম্মিলিত আচরণকে বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তাঁর জীবন প্রমাণ করে দিল, বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে মৌলিক অবদান অনেক সময় নিঃশব্দে ঘটে। জোসিয়া উইলার্ড গিবস ছিলেন সেই নীরব স্থপতিদের একজন, যাঁর নাম হয়তো তাঁর সময়ে খুব কম মানুষ জানত, কিন্তু আধুনিক পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের বহু মৌলিক সমীকরণ আজও তাঁর নাম বহন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × two =