লং কোভিডের অদৃশ্য মানচিত্র

লং কোভিডের অদৃশ্য মানচিত্র

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

লং কোভিড যদি সত্যিই একটি বিশ্বজোড়া মহামারি হয়, তবে তার মানচিত্র একরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে রোগীরা প্রকাশ্যে বলেন, মস্তিষ্ক যেন কুয়াশাচ্ছন্ন, স্মৃতি পিছলে যাচ্ছে, মন বিষণ্ণ, সেখানে ভারতের মতো দেশে সেই একই উপসর্গ যেন প্রায় অদৃশ্য। তাহলে প্রশ্ন হল, শরীর কি আলাদা ভাবে অসুস্থ হচ্ছে, নাকি সমাজ আলাদা ভাবে অসুখটাকে দেখছে? নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণা এই অস্বস্তিকর প্রশ্নকেই সামনে এনেছে। চার মহাদেশ জুড়ে, চারটি দেশের ৩,১০০-র বেশি লং কোভিড রোগীর উপর চালানো এই গবেষণায় সরাসরি তুলনা করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কোভিডের স্নায়বিক ও মানসিক উপসর্গ নিয়ে। তাতে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে কোভিডে হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীদের ৮৬ শতাংশ জানিয়েছেন তারা “ মস্তিষ্কের কুয়াশাচ্ছন্নতায়” ভুগছেন। অর্থাৎ মনোযোগে ঘাটতি, স্মৃতির সমস্যা, চিন্তার গতি ধীর হয়ে যাওয়া। একই উপসর্গ ভারতে রিপোর্ট করেছেন মাত্র ১৫ শতাংশ রোগী। নাইজেরিয়ায় এই হার ৬৩ শতাংশ, কলম্বিয়ায় ৬২ শতাংশ। সংখ্যাগুলো যেন বলছে, রোগ নয়, রিপোর্টিং-ই আলাদা। আসলে এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা ভাইরাসের জিনে নেই, বরং সমাজের কাঠামোতে আছে। গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে লং কোভিড রোগীরা বেশি ভুগছেন, এমন সিদ্ধান্ত টানা ভুল হবে। আসলে তারা বেশি বলছেন। বলার সুযোগ আছে, বলার ভাষা আছে, বললে চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও চিত্র একই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি না-হওয়া কোভিড রোগী বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের কথা বলেছেন। অন্যান্য দেশে সেই হার অনেক কম, অথচ স্নায়বিক উপসর্গ, যেমন- ক্লান্তি, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, মাথা ঘোরা, অসাড়তা সব দেশেই কমবেশি উপস্থিত। প্রধান গবেষক ইগর কোরালনিকের ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়ায় মানসিক ও বোধবুদ্ধির সমস্যার কথা বলা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু নাইজেরিয়া ও ভারতে তা নয়।“ তাঁর মতে, মানসিক অসুখকে কৃষ্টির দিক থেকে অস্বীকার, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক কলঙ্ক, স্বাস্থ্য-শিক্ষার অভাব এবং চিকিৎসা পরিষেবার সংকট, সব মিলিয়ে উপসর্গের রিপোর্টিং মারাত্মকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ছে। এখানেই রাজনৈতিক দিকটি সামনে আসে। উপসর্গের ধরন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এই বিভাজন মূলত ভৌগোলিক নয়, আয়ের স্তরভিত্তিক। উচ্চ ও মধ্য-উচ্চ আয়ের দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া) একদিকে, আর নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ (ভারত, নাইজেরিয়া) অন্যদিকে। লং কোভিড যেন আয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভাষা বদলায়। ঘুমের সমস্যাতেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬০ শতাংশ ‘অনিদ্রার’ কথা বলেছেন। অন্য দেশগুলোতে এই হার এক-তৃতীয়াংশ বা তারও কম। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা হয়েছে। শিকাগো, মেডেলিন, লাগোস ও জয়পুর, এই চারটি একাডেমিক মেডিক্যাল সেন্টার থেকে রোগীরা এতে অংশ নেন। মানসম্মত স্নায়বিক ও বোধবুদ্ধিগত মূল্যায়ন ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যাতে তুলনা করা সম্ভব। লং কোভিড বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করছে। অনুমান বলছে, কোভিডে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ১০–৩০ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গ থেকে যায়। আর এই রোগ সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে কর্মক্ষম, তরুণ ও মধ্যবয়সি মানুষদের, যারা সমাজের উৎপাদনশীল স্তম্ভ। গবেষকেরা এখন কলম্বিয়া ও নাইজেরিয়ায় লং কোভিড জনিত কুয়াশাচ্ছন্ন মস্তিষ্কের জন্য বোধবুদ্ধিগত চিকিৎসা পরীক্ষা করছেন। এ জন্য তাঁরা শিকাগোর শার্লি রায়ান অ্যাবিলিটি ল্যাবে ব্যবহৃত প্রোটোকল অনুসরণ করছেন। সুতরাং লং কোভিড কেবল একটি মেডিক্যাল সমস্যা নয়, এ এক সামাজিক আয়না। যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে অসুখ নীরব। যেখানে কথা বলার সুযোগ আছে, সেখানে যন্ত্রণা দৃশ্যমান।

 

সূত্র: A cross-continental comparative analysis of the neurological manifestations of Long COVID. Frontiers in Human Neuroscience, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − one =