‘লং কোভিডে’র চিকিৎসা 

‘লং কোভিডে’র চিকিৎসা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬

করোনা সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরও যদি দুই মাসের বেশি সময় ধরে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঝিমঝিম বা শরীর ভাঙা ভাব থেকে যায়, তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ভাষায় সেটাই ‘লং কোভিড’। এর কোনো একটি মাত্র কারণ নেই, নেই নির্দিষ্ট ওষুধও। কিন্তু সমস্যাটা ছোট নয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ এখন এই দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, লং কোভিড আসলে একাধিক সমস্যার জটিল জটলা।

প্রথমত, অনেক মানুষের শরীর থেকে করোনার কিছু অংশ পুরোপুরি নির্মূল হয় না। ভাইরাসের এই “অবশিষ্ট উপস্থিতি” শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সবসময় সক্রিয় রাখে। দ্বিতীয়ত, শরীরের ভিতরে তৈরি হয় নীরব প্রদাহ যেখানে IL-1β, IL-6, TNF-α-এর মতো প্রদাহজনক উপাদান দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় থাকে। এতে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রক্তনালি, হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র। তৃতীয়ত, ভাইরাস বর্ধক প্রোটিন রক্তের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে অতি ক্ষুদ্র জমাট রক্তের ডেলা (মাইক্রো-ক্লট)। এগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু রক্তপ্রবাহকে ব্যাহত করে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছাতে বাধা দেয়। এছাড়াও দেখা যাচ্ছে, অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং কোষের শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা (মাইটোকন্ড্রিয়া) দুর্বল হয়ে পড়া। সব মিলিয়ে লং কোভিড একসঙ্গে আঘাত হানে বহু অঙ্গে। রক্তনালি, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, স্নায়ু, কিডনি, লিভার এমনকি হরমোন ব্যবস্থাতেও। এই কারণেই লং কোভিডের লক্ষণ একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কারও প্রচণ্ড ক্লান্তি বা ব্রেন ফগ অথবা স্মৃতিভ্রংশ, আবার কারও হৃদযন্ত্রে প্রদাহ এমনকি স্নায়ুর সূক্ষ্ম ক্ষতি, মাসিক চক্রের পরিবর্তন এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। লং কোভিড তাই কোনো “একটা রোগ” নয়, একটি বহু-ব্যবস্থা বিপর্যয়। এখনও পর্যন্ত লং কোভিডের জন্য অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে হালকা উপসর্গে প্রথম ধাপ হিসেবে চিকিৎসা সবচেয়ে নিরাপদ। গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন ও দলভিত্তিক শারীরিক-মানসিক পুনর্বাসন কর্মসূচি রোগীদের জীবনমান কিছুটা উন্নত করতে পারে। শ্বাসের ব্যায়াম ও শ্বাস গ্রহণের পেশি প্রশিক্ষণ ফুসফুস ও হার্টের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে একটা সতর্কতা আছে। অতিরিক্ত বা ভুল ব্যায়াম কিন্তু উল্টে প্রদাহ বাড়াতে পারে। তাই ধীরে ধীরে, উপসর্গ বুঝে কাজ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। কোভিডের শুরুতেই কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নিলে লং কোভিডের ঝুঁকি কিছুটা কমে।

জাপানে একটি ওষুধে প্রায় ২৫ শতাংশ ঝুঁকি কমার প্রমাণ মিলেছে। ডায়াবেটিসের মেটফরমিন নামের পরিচিত ওষুধটি সংক্রমণের প্রথম সপ্তাহে দিলে লং কোভিডের ঝুঁকি ৪১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সম্ভবত প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের কারণেই। রক্ত জমাট বাঁধা, স্নায়ুর সমস্যা বা ইমিউন ভারসাম্য ঠিক করতে আলাদা আলাদা ওষুধ নিয়েও পরীক্ষা চলছে। কম মাত্রার নালট্রেক্সোন ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করেছে। কিছু ক্ষেত্রে রক্ত পরিষ্কার করার পদ্ধতিও ব্যবহার হচ্ছে, যদিও তা ব্যয়বহুল এবং সাময়িক উপকার দেয়। গবেষকেরা এখন এমন থেরাপির দিকেও তাকাচ্ছেন, যা সরাসরি প্রদাহের মূল উৎসে আঘাত করে।

ফাইব্রিন-জনিত স্নায়ু প্রদাহ ঠেকাতে নতুন অ্যান্টিবডি নিয়ে ট্রায়াল শুরু হয়েছে। এছাড়া হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি স্মৃতি, ঘুম ও ব্যথা কমাতে উপকার দিয়েছে। আকুপাংচারেও কিছু রোগীর উপসর্গ কমেছে। লং কোভিড এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি। আশার কথা, গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত যে ছোট ছোট গবেষণায় ভরসা না করে এখন দরকার বড়, সুসংগঠিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। ততদিন পর্যন্ত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হল ধৈর্য ধরা, ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা আর ধীরে সুস্থে পুনর্বাসন।

 

সূত্র: Insights into potential therapeutic approaches for long COVID. Frontiers of Medicine, 2025; Science Daily

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 1 =