লক্ষ্মীপেঁচার পালকের রং বদল

লক্ষ্মীপেঁচার পালকের রং বদল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ নভেম্বর, ২০২৬

গত তিন দশকে সুইজারল্যান্ডের বার্ন আউল বা লক্ষ্মীপেঁচাদের পালকের রং ক্রমশ লালচে-বাদামি হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, তাদের শরীরে কালো কালো ছোপের সংখ্যাও বাড়ছে। ৩,০০০-এরও বেশি পেঁচার সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবে মাত্র প্রায় ১০ প্রজন্মের মধ্যেই এই পরিবর্তন ঘটেছে। তবে এই বিবর্তনের সঙ্গে শুধু পালকের রং নয়, পরিবেশের চাপ সামলানোর ক্ষমতারও সম্পর্ক রয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দীর্ঘসময় ধরে সংগৃহীত তথ্য ও জিনগত নমুনা বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তনের সন্ধান পেয়েছেন। গবেষণাটি সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে নেচার কমিউনিকেশন্স পত্রিকায়। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল, পালকের রং ও গায়ের কালো ছোপের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলি সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলেছে, তা বোঝা। তাঁরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক যদৃচ্ছ (random) পরিবর্তনের সঙ্গে বাস্তবে দেখা জিনগত পরিবর্তনের তুলনা করেন। তাতে দেখা যায়, লালচে-বাদামি পালকের জন্য দায়ী একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য যত দ্রুত বেড়েছে, তা কেবল যদৃচ্ছ (random) বিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনকে হিসাবের মধ্যে রাখলেই এই পরিবর্তনের যথাযথ ব্যাখ্যা মেলে।

৩,০০০-এরও বেশি পেঁচার সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করে গবেষকরা পালকের রং ও ছোপের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনগত অঞ্চল শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে MC1R জিন, যা শরীরের রঞ্জক পদার্থ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, পালকের রংই যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মূল লক্ষ্য, তা এখনও নিশ্চিত নয়। MC1R জিনের সঙ্গে শরীরের মেলানোকর্টিন ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে, যা মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া ও আক্রমণাত্মক আচরণের মতো বৈশিষ্ট্যকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে পেঁচাদের আচরণ বা চাপ মোকাবিলার ক্ষমতার ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করছে, আর পালকের রং বদলাচ্ছে তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে। এমনটাই সম্ভাব্য ঘটনা।

আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, পালকের রঙের সঙ্গে পেঁচাদের খাদ্যাভ্যাস, শিকারের কৌশল ও প্রজননক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, সাদা পালকের পেঁচারা চাঁদের আলো কাজে লাগিয়ে শিকার ধরতে পারে। অন্যদিকে, লালচে-বাদামি পেঁচাদের খাদ্যতালিকায় ভোল জাতীয় ইঁদুরের প্রাধান্য বেশি। আবার শরীরে বড় কালো ছোপ থাকা পেঁচাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং খাদ্যাভাব ও পরজীবী প্রভৃতি পরিবেশগত চাপ সামলানোর ক্ষমতা তুলনায় বেশি হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, খাদ্যের জোগানে পরিবর্তন কিংবা পরিবেশগত চাপ বৃদ্ধির ফলে এই বিবর্তন ঘটতে পারে। তবে ঠিক কোন পরিবেশগত কারণ এর জন্য দায়ী, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিবর্তন যে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা কোনও ধীর প্রক্রিয়া নয়, বরং মাত্র কয়েক প্রজন্মের মধ্যেও জিনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলেছে। গবেষকরা এবার পেঁচাদের ছবি কম্পিউটারের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে পালকের রং ও কালো ছোপের পরিবর্তন আরও নিখুঁতভাবে মাপতে চান। পাশাপাশি, জিনগত তথ্য ব্যবহার করে অকালমৃত পেঁচাদের পালকের সম্ভাব্য রংও পুনর্গঠন করবেন তাঁরা। এর মাধ্যমে কোন বৈশিষ্ট্য পেঁচাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়, তা বোঝার চেষ্টা করবেন। তাঁদের মতে, দ্রুত অভিযোজনের এই ক্ষমতা জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বন্য প্রাণীদের সাহায্য করতে পারে।

সূত্র: “Genomic bases of short-term evolution in wild barn owls revealed by long-term monitoring and population-scale sequencing” by Tristan Cumer, Alexandros Topaloudis,et.al;12th October 2026, published in Nature Communications. DOI: 10.1038/s41467-026-78632-4

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 7 =