কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার রাজনীতি এবং মানুষের মনের অনিশ্চয়তা , এই তিন বিষয়কে একসঙ্গে নিয়ে গড়ে ওঠা বিখ্যাত নাটক ‘কোপেনহেগেন’ আবার মঞ্চে ফিরেছে। বর্তমানে নাটকটির নতুন প্রযোজনা চলছে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড থিয়েটার-এ। ১৯৯৮ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হওয়ার পর এটি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এবারও নতুন করে এটি আলোচনায় ফিরেছে। নাটকটি লিখেছেন ব্রিটিশ নাট্যকার মাইকেল ফ্রেইন। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৪১ সালের এক ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ। সে সময় নাৎসি অধিকৃত ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ দেখা করতে যান তাঁর পুরোনো শিক্ষক নীলস বোর-এর সঙ্গে। সেই সাক্ষাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য আজও রহস্যে ঢাকা। আর সেই অনিশ্চয়তাকেই নাটকের মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন লেখক। নতুন প্রযোজনায় হাইজেনবার্গের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ড্যামিয়েন মোলনি, নীলস বোরের চরিত্রে রিচার্ড শিফ, আর বোরের স্ত্রী মার্গ্রেথে বোর-এর ভূমিকায় অ্যালেক্স কিংস্টন। মাত্র তিনটি চরিত্র নিয়ে এগোলেও নাটকটির আবেগ, বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব একে এক বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। নাটকের শুরুতেই দর্শক ফিরে যান ১৯২৫ সালে। তখন হাইজেনবার্গ জার্মানির হেলগোল্যান্ড দ্বীপে একা বসে কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে ভাবছিলেন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সেই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুমিত। নতুন মঞ্চায়নে সেই দৃশ্য অভিনবভাবে তুলে ধরা হয়েছে, মঞ্চে জলের মধ্যে চেয়ারের পিঠে বসে থাকা অভিনেতার মাধ্যমে। তবে নাটকের মূল প্রশ্ন ১৯৪১ সালকে ঘিরে। কেন হাইজেনবার্গ কোপেনহেগেনে গিয়েছিলেন? তিনি কি মিত্রশক্তির পারমাণবিক পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন? নাকি জার্মানির পারমাণবিক বোমা প্রকল্পে বোরকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন? আবার কেউ কেউ মনে করেন, তিনি হয়তো সতর্ক করতে গিয়েছিলেন যে জার্মানি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে। প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। কারণ সেই বৈঠকে আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। জানা যায়, দুজন একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করেছিলেন এবং অল্প হাঁটাহাঁটি করেছিলেন। কিন্তু ঠিক কী কথা হয়েছিল, তা কেউ জানে না। তবে ঐ ঘটনার পর তাদের বন্ধুত্বে স্থায়ী ফাটল ধরে। মাইকেল ফ্রেইন নিজেও বলেছেন, তিনি হাইজেনবার্গের উদ্দেশ্য নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে চাননি। তাঁর মতে, নাটকটি আসলে মানুষের উদ্দেশ্য ও চিন্তার অনিশ্চয়তা নিয়ে। যেমন কোয়ান্টাম জগতে সবকিছু নির্দিষ্ট নয়, তেমনি মানুষের মনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। প্রথম মঞ্চস্থ হওয়ার পর নাটকটি বিপুল সাফল্য পেয়েছিল। লন্ডন ও নিউইয়র্কে ৩০০-র বেশি শো হয়েছিল। এটি টনি অ্যাওয়ার্ড-সহ একাধিক সম্মাননা লাভ করে। বিজ্ঞানভিত্তিক নাটকের এমন জনপ্রিয়তা খুবই বিরল। নতুন প্রযোজনার পরিচালক মাইকেল লংহার্স্ট বলেছেন, এই নাটক আবার মঞ্চে ফেরানো একটা বড় সুযোগ। তাঁর মতে, তিন চরিত্রের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনই নাটকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কখনো তারা বিচারক, কখনো সাক্ষী, কখনও অভিযুক্ত- এই ভূমিকাগুলো ক্রমাগত বদলাতে থাকে। ইতিহাসবিদদের কাছেও এই ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়। ২০০১ সালে নীলস বোর পরিবারের সংরক্ষিত কিছু গোপন চিঠি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ধারণা করা হয়েছিল, সেই নথি হয়তো ১৯৪১ সালের সাক্ষাৎ সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে। কিছু গবেষক মনে করেন, হাইজেনবার্গ বোরকে জানাতে চেয়েছিলেন যে জার্মানি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছে। অন্যরা মনে করেন, এর পেছনে নৈতিক কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। নাটকটির শক্তি শুধু ইতিহাসে নয়, মানবিক প্রশ্নেও। যুদ্ধের সময় বিজ্ঞানীর দায়িত্ব কী? জ্ঞান কি নিরপেক্ষ? নাকি তার ব্যবহারই সবকিছু নির্ধারণ করে? এমন বহু প্রশ্ন দর্শকের সামনে তুলে ধরে ‘কোপেনহেগেন’। সমালোচকেরা বহু আগেই নাটকটিকে “বিজ্ঞানকে মানবিক করে তোলা অসাধারণ শিল্পকর্ম” বলে আখ্যা দিয়েছেন। নতুন প্রযোজনাও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখছে। লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড থিয়েটারে নাটকটি চলবে ২ মে ২০২৬ পর্যন্ত। বিজ্ঞান, ইতিহাস ও নাটকপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বিশেষ আকর্ষণ।
সূত্র: Helenthehare; 14 Apr 2026
