সম্প্রতি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের একেবারে প্রাচীন সময়ের অসংখ্য রহস্যময় ক্ষুদ্র লাল আলোকবিন্দু আবিষ্কার করেছে। এগুলো এত উজ্জ্বল যে প্রথমে সক্রিয় ব্ল্যাক হোলের মতো মনে হয়। কিন্তু তাদের আলো ও বর্ণালীতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা সাধারণ ব্ল্যাক হোল বা নক্ষত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এবার আন্তর্জাতিক একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করছেন, এই লাল বিন্দুগুলোর ভেতরে হয়তো লুকিয়ে আছে জায়মান অতিকায় ব্ল্যাক হোল। গবেষণাটির বিবরণ বিস্তারিতভাবে নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
এর নেতৃত্ব দিয়েছেন হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় ও এম আই টি-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী রোহন নাইডু। তাঁর দল মনে করছে, ক্ষুদ্র লাল আলোর বিন্দুর কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল থাকা সম্ভব। তাকে ঘিরে রয়েছে অত্যন্ত ঘন গ্যাসের আবরণ। এই সম্ভাব্য বস্তুটিকে বলা হচ্ছে ব্ল্যাক-হোল স্টার।
এই ধারণা অনুযায়ী, ব্ল্যাক হোলটি চারপাশের গ্যাস ক্রমাগত নিজের মধ্যে টেনে নেবে। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল শক্তি ও বিকিরণ তৈরি হবে। সেই বিকিরণ শোষণ করে উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে ঘন গ্যাসের আবরণ। ফলে বাইরে থেকে পুরো বস্তুটিকে অনেকটা এক বিশাল উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দেখা যাবে।
এই ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে MoM-BH-1 নামক একটি ক্ষুদ্র লাল আলোর বিন্দুতে। বস্তুটি একটি সাধারণ নক্ষত্রের তুলনায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন গুণ বেশি উজ্জ্বল এবং নিজের ছায়াপথেও ব্যাপকভাবে ছাপিয়ে গেছে। এর আলোর বর্ণালীতে হাইড্রোজেনের নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী বামার বিচ্যুতি দেখা গেছে। হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন শক্তিস্তরের পরিবর্তনের কারণে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলোর তীব্রতার এই বিচ্যুতি ঘটে। এই বৈশিষ্ট্য সাধারণ তরুণ নক্ষত্রে দেখা যায়। কিন্তু MoM-BH-1- এ এই বিচ্যুতি আগের যেকোনো নিদর্শনের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি শক্তিশালী।
কম্পিউটার সিমুলেশন ও আলোর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা অনুমান করেছেন, এর কেন্দ্রে প্রায় ১ লাখ সূর্যের ভরের সমান একটি ব্ল্যাক হোল রয়েছে আর সেটিকে ঘিরে রয়েছে অত্যন্ত ঘন গ্যাসের আবরণ।
তবে ব্ল্যাক হোলটি কীভাবে তৈরি হলো, সেটিই আসল প্রশ্ন। গবেষকরা এর এক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মহাবিস্ফোরণের প্রায় ১৫ কোটি বছর পর মহাবিশ্বের ঘন হাইড্রোজেন-হিলিয়াম গ্যাস থেকে অত্যন্ত বিশাল অতিকায় নক্ষত্র তৈরি হয়েছিল। তার ভর সূর্যের চেয়ে হাজার গুণ বেশি হতে পারে। পরে প্রকাণ্ড কোনো বিস্ফোরণে তার বাইরের গ্যাস ছিটকে পড়ে এবং নক্ষত্রটি ধসে পড়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে। চারপাশের অবশিষ্ট গ্যাসের আবরণই তখন ব্ল্যাক-হোল স্টার-এর মতো দেখা যেতে পারে।
এই আবরণ ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে একসময় ব্ল্যাক হোলকে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। এমনকি গবেষকেরা মনে করছেন, এই বিশাল নক্ষত্রগুলোই হয়তো আজকের মহাবিশ্বের অনেক অতিকায় ব্ল্যাক হোলের আদিম পূর্বসূরি।
সূত্র: ‘Little red dots’ could herald the birth of supermassive black holes, Physics World, 20th August 2026.
